নবাবগঞ্জে অসহায়ের জমি মসজিদ কমিটির কব্জায়!
নবাবগঞ্জে অসহায়ের জমি মসজিদ কমিটির কব্জায়!
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা:
ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার নতুন বান্দুরায় অবস্থিত ঐতিহাসিক ভাঙা/শাহী মসজিদটি নিয়ে স্থানীয় মসজিদ কমিটির বিরুদ্ধে জমি জবরদখল, সালিশ অমান্য এবং দুর্নীতির এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, মসজিদ কমিটি অবৈধভাবে গরিব কয়েকজন ওয়ারিশের পৈতৃক সম্পত্তি দখল করে রেখেছে। শুধু তাই নয়, জমি ফেরত চাইলে নানা হুমকি, সালিশের নামমাত্র প্রস্তাব এবং সম্প্রতি তথ্য সংগ্রহ করতে যাওয়া সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পুলিশ দিয়ে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে কমিটির লোকজনের বিরুদ্ধে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভাঙা/শাহী মসজিদের জায়গা বা সম্পত্তির মোট ৪৪ শতাংশের বৈধ ওয়ারিশ ও রেকর্ডকৃত মালিক স্থানীয় কয়েকজন অসহায় ব্যক্তি। কিন্তু বর্তমান মসজিদ কমিটি সম্পূর্ণ অবৈধভাবে এই সম্পত্তি ভোগদখল করে আসছে।
এ বিষয়ে দুই বছর পূর্বে ভুক্তভোগী ওয়ারিশগণ নবাবগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। তৎকালীন অফিসার ইনচার্জ মো. মমিনুল ইসলাম উভয় পক্ষকে থানায় ডেকে সালিশের ব্যবস্থা করেন। বান্দুরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যানসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থেকে সিদ্ধান্ত দেন যে, মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে ৪২-৪৪ শতাংশ জায়গার ক্ষতিপূরণ বাবদ ওয়ারিশদের ৭ লাখ টাকা দেওয়া হবে।
তবে জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা হওয়ায় ওয়ারিশরা এই নামমাত্র ৭ লাখ টাকার প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন এবং তাঁদের পৈতৃক জমি বুঝিয়ে দেওয়ার দাবি জানান। এরপর ওয়ারিশরা একাধিকবার মসজিদ কমিটির সাথে সমঝোতার চেষ্টা করলেও কমিটি তা সম্পূর্ণ এড়িয়ে যায় এবং তাদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখাতে থাকে।
দীর্ঘমেয়াদী দান আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ
জমি জবরদখলের পাশাপাশি মসজিদ কমিটিতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন এলাকাবাসী। অভিযোগ রয়েছে, প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের পর মসজিদে অগণিত হাঁস, মুরগি, চাল, ডাল, খাসি ইত্যাদি দান করা হয়। যার আনুমানিক মূল্য প্রতি সপ্তাহে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা। দীর্ঘ ৪০ থেকে ৫০ বছর ধরে মসজিদ কমিটির সদস্যরা এই বিপুল পরিমাণ দানসামগ্রী ও অর্থ আত্মসাৎ করে আসছন। পবিত্র এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে এমন দুর্নীতির ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।
এদিকে এ ঘটনার আদ্যপান্ত জানতে গত ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (শুক্রবার) জুমার দিন বস্তুনিষ্ঠ তথ্য সংগ্রহ করতে ভাঙা/শাহী মসজিদে যান স্থানীয় সংবাদকর্মীরা। নামাজ শেষে মসজিদ কমিটির সদস্যরা সাংবাদিকদের সাথে অশোভন আচরণ শুরু করেন এবং বিভিন্ন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেন।
সাংবাদিকরা পেশাগত দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে নামাজ শেষে কথা বলার অনুরোধ করলেও, মসজিদ কমিটির লোকজন মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে নবাবগঞ্জ থানা থেকে পুলিশ নিয়ে হাজির হন। পুলিশ এসে সাংবাদিকদের উপস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সাংবাদিকরা জানান তারা পেশাগত তথ্য সংগ্রহ করতে এসেছেন।
এ সময় পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, মসজিদে গণ্ডগোল বা মারামারির খবর পেয়ে তারা এসেছেন। উপস্থিত সাংবাদিকরা তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, একটি ধর্মীয় পবিত্র স্থানে সাংবাদিকরা কখনো গণ্ডগোল করতে আসেন না। পরবর্তীতে পুলিশ মসজিদ কমিটির লোকজনের সাথে কথা বলে চলে যায়।
ভুক্তভোগীদের দাবি, তাদের আইনি লড়াইয়ের সামর্থ্য না থাকায় অসহায় ওয়ারিশরা এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, একটি পবিত্র প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে এমন জবরদখল, সালিশ অমান্য এবং সাংবাদিকদের হয়রানির ঘটনা অত্যন্ত নিন্দনীয়। অবিলম্বে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের নিরপেক্ষ হস্তক্ষেপে প্রকৃত ওয়ারিশদের জমি বুঝিয়ে দেওয়া এবং মসজিদের অর্থ আত্মসাৎকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহে নবাবগঞ্জ থানার পুলিশের বাধা প্রসংগে নবাবগঞ্জ থানার অফিসার্স ইনচার্জ ( আবু হানিফ ) এর নিকট এবিষয়ে মুঠোফোনে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, এটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। সাংবাদিকরা আমাদের বন্ধু, তাদের সাথে খারাপ আচরণ বা তথ্য সংগ্রহে বাধা দেয়া যাবে না। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।

Leave a Reply