ঢাকাSunday , 20 September 2026
  1. Mobile Phones
  2. Photography
  3. Video
  4. অনলাইন
  5. অপরাধ
  6. আন্তর্জাতিক
  7. আশাশুনি
  8. ইসলাম
  9. উন্নয়ন
  10. উপকূল
  11. এক্সক্লুসিভ
  12. এনজিও
  13. কয়রা
  14. কলাম
  15. কলারোয়া

অপ্রতিম ও আজমুলের করুণ মৃত্যু: তুচ্ছ ঘটনায় প্রাণহানি—কোথায় মানবিকতার মূল্যবোধ?

Majharul islam ঢাকা
আপডেট: 20 September 2026, 21:35

অপ্রতিম ও আজমুলের করুণ মৃত্যু: তুচ্ছ ঘটনায় প্রাণহানি—কোথায় মানবিকতার মূল্যবোধ?

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

একটি আইফোন। এক প্লেট ভাত। আর দুটি অসমাপ্ত জীবন। কুমিল্লার কিশোর ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম এবং খুলনার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মো. আজমুল হোসেনের মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের সামনে এমন এক প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে, যার উত্তর শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা আদালতের কাছে খুঁজলে হবে না। প্রশ্নটি আমাদের পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র—সবার জন্য।

মানুষের জীবনের চেয়ে কি একটি মোবাইল ফোন মূল্যবান? খাবার নিয়ে কোনো অভিযোগ কি একজন মানুষকে মারধর বা হত্যার বৈধ কারণ হতে পারে? কোনো সন্দেহ বা ক্ষোভ কি কাউকে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার দেয়? অবশ্যই নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সামান্য বিষয়কে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনা ঘটছে এবং কখনো কখনো তার পরিণতি হচ্ছে প্রাণহানি। অপ্রতিম ও আজমুলের মৃত্যু তাই শুধু দুটি পরিবারের ব্যক্তিগত শোক নয়; এটি আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ ও মানবিকতারও কঠিন পরীক্ষা।

অপ্রতিমের মর্মান্তিক পরিণতি

১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম ছিল কুমিল্লার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার মা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম। পরিবারের একমাত্র সন্তান অপ্রতিমের সামনে ছিল দীর্ঘ ভবিষ্যৎ, পড়াশোনা ও অসংখ্য স্বপ্ন।

প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে সে মায়ের আইফোন নিয়ে কোটবাড়ির বাসা থেকে বের হয়। এরপর আর বাড়ি ফেরেনি। পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয় এবং তাকে খোঁজা শুরু হয়। পরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, অপ্রতিমের মাথায় আঘাতের চিহ্ন ছিল। তার সঙ্গে থাকা আইফোনটিও তখন পাওয়া যায়নি। পরে তদন্তের অংশ হিসেবে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং ফোন উদ্ধারের খবর প্রকাশিত হয়। তবে হত্যার প্রকৃত কারণ, ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং দায় কার—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায়।

একটি শিশুর এমন মৃত্যু শুধু তার পরিবারকে নিঃস্ব করে না, সমাজের নিরাপত্তাবোধকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে। যে বয়সে একটি শিশুর হাতে থাকার কথা বই, খেলাধুলার সরঞ্জাম কিংবা স্বপ্নের খাতা, সেই বয়সে তার জীবন যদি সহিংসতার শিকার হয়, তাহলে আমাদের চারপাশের পরিবেশ নিয়ে নতুন করে ভাবতেই হবে।

আজমুলের অসমাপ্ত স্বপ্ন

খুলনার মো. আজমুল হোসেন ছিলেন নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী। চুয়াডাঙ্গার দর্শনার বড় শলুয়া গ্রামের কৃষক পরিবারের সন্তান আজমুল উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে খুলনায় এসেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর মাত্র কয়েক দিন যেতে না যেতেই তার জীবন থেমে যায়।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের ইসলামনগর এলাকার একটি ছাত্রাবাসে তাকে ‘ভাত চুরি করে খাওয়ার’ অভিযোগে মারধর করা হয়। পরে তাকে চারতলার ছাদ থেকে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

ঘটনার পর আজমুলের বাবা হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে আরও অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে বলে সংবাদে এসেছে। পুরো ঘটনাই তদন্তাধীন; তাই চূড়ান্ত দায় ও ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে।
কিন্তু অভিযোগটি সত্য হোক বা মিথ্যা—কোনোভাবেই একজন মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। কারও বিরুদ্ধে খাবার চুরির অভিযোগ থাকলে তা যাচাই করা যেত, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো যেত। কিন্তু অভিযোগের বিচার করার নামে শারীরিক নির্যাতন কোনো সভ্য সমাজের আচরণ হতে পারে না।

তুচ্ছ বিষয় থেকে কেন এত বড় সহিংসতা?

অপ্রতিম ও আজমুলের ঘটনার প্রেক্ষাপট এক নয়। একজন শিশু, অন্যজন তরুণ। একটি ঘটনায় মোবাইল ফোনকে কেন্দ্র করে হত্যার অভিযোগ, অন্য ঘটনায় খাবার নিয়ে অভিযোগের পর সহিংসতার কথা সামনে এসেছে। কিন্তু উভয় ঘটনাই একটি বড় সামাজিক সংকটের দিকে ইঙ্গিত করে—আমাদের মধ্যে সহনশীলতা ও মানবিকতার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে কি না।

রাগ, ক্ষোভ, সন্দেহ কিংবা লোভ মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি। কিন্তু সভ্যতার শিক্ষা হলো—এই অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অভিযোগের সমাধান করতে হবে আইন ও যুক্তির মাধ্যমে। প্রতিশোধের মাধ্যমে নয়।

আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন জায়গায় চুরি, ছিনতাই, অপহরণ বা অন্য কোনো অপরাধের সন্দেহকে কেন্দ্র করে গণপিটুনি ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা উদ্বেগ তৈরি করেছে।
কেউ অপরাধ করেছে কি না, তা নির্ধারণের দায়িত্ব তদন্তকারী সংস্থা ও আদালতের। জনতার সন্দেহ কখনো অপরাধের চূড়ান্ত প্রমাণ হতে পারে না। ভুল সন্দেহের কারণে নিরপরাধ মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।

গণপিটুনি কোনো বিচার নয়। বরং এটি নিজেই আইনভঙ্গের ঘটনা। তাই কোনো অভিযোগ উঠলে উত্তেজিত না হয়ে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে হবে। রাষ্ট্রকেও এমন অপরাধের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও ধারাবাহিক ব্যবস্থা নিতে হবে।

পরিবার থেকেই শুরু হোক মানবিকতার শিক্ষা

মানবিক মূল্যবোধের প্রথম বিদ্যালয় পরিবার। সন্তানকে শুধু ভালো ফলাফল, ভালো চাকরি বা অর্থনৈতিক সাফল্যের জন্য প্রস্তুত করলেই হবে না; তাকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

শিশু-কিশোরদের শেখাতে হবে—অন্যের সম্পদকে সম্মান করতে হয়, রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, অভিযোগ থাকলে কর্তৃপক্ষকে জানাতে হয় এবং কাউকে অপমান বা আঘাত করা কোনো সমস্যার সমাধান নয়।
অভিভাবকদের সন্তানদের সঙ্গে পর্যাপ্ত সময় কাটাতে হবে। তারা কার সঙ্গে মিশছে, কী ধরনের আচরণ করছে এবং কোন পরিবেশে বেড়ে উঠছে—এসব বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু জ্ঞান অর্জনের জায়গা নয়; এখানেই ভবিষ্যৎ নাগরিকের মূল্যবোধ গড়ে ওঠে। তাই বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সহমর্মিতা, সহনশীলতা, বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধার শিক্ষা আরও গুরুত্বের সঙ্গে দিতে হবে।

ছাত্রাবাস ও মেসে কোনো অভিযোগ উঠলে তার জন্য নিরপেক্ষ অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকা দরকার। কোনো শিক্ষার্থীকে অপমান, মারধর বা ভয় দেখিয়ে ‘শিক্ষা’ দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।

সমাজের ভূমিকা

একটি ঘটনা ঘটার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়। সমাজকে প্রতিরোধমূলক ভূমিকা নিতে হবে।

কিশোর গ্যাং, মাদক, অপরাধপ্রবণতা ও সহিংসতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে স্থানীয় পর্যায়ে পরিবার, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, সমাজকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তরুণদের খেলাধুলা, সংস্কৃতি, স্বেচ্ছাসেবা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার সুযোগ বাড়াতে হবে।

কোনো এলাকায় অপরাধের পূর্বলক্ষণ দেখা দিলে তা উপেক্ষা না করে দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো দরকার।

রাষ্ট্রের করণীয়

রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অপ্রতিম ও আজমুলের মৃত্যুর মতো প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধের সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, তাদের পরিচয়, অর্থ বা সামাজিক প্রভাব যেন তদন্ত ও বিচারকে প্রভাবিত না করে।

একই সঙ্গে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া, গণপিটুনি এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। দরিদ্র ও অসহায় পরিবার যাতে অর্থের অভাবে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হয়, সে জন্য রাষ্ট্রীয় আইনি সহায়তা আরও সহজলভ্য ও কার্যকর করা প্রয়োজন।

ভবিষ্যতে যেন আর কোনো অপ্রতিম-আজমুল না হারায়

অপ্রতিম ও আজমুলের মতো ঘটনা রোধ করতে শুধু অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করলেই হবে না; অপরাধের সামাজিক কারণগুলোও মোকাবিলা করতে হবে। পরিবারকে সন্তানকে সময় দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। সমাজকে সহিংসতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। রাষ্ট্রকে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—অভিযোগকে বিচার মনে করা যাবে না। সন্দেহকে সত্য মনে করা যাবে না। রাগকে শাস্তির অধিকার মনে করা যাবে না।

পরিশেষে বলা যায়, অপ্রতিম আর আজমুল আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। তাদের পরিবারের শূন্যতা কোনো বিচার বা শাস্তি দিয়ে পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু তাদের মৃত্যু থেকে শিক্ষা নেওয়া সম্ভব।একটি আইফোনের মূল্য থাকতে পারে, এক প্লেট ভাতের মূল্য থাকতে পারে; কিন্তু একটি মানুষের জীবনের সঙ্গে কোনো বস্তু বা সম্পদের তুলনা চলে না। একটি শিশুর জীবন মানে একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি তরুণের জীবন মানে একটি ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। তাই এখনই আমাদের অঙ্গীকার করতে হবে—কোনো তুচ্ছ অভিযোগে কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নেবে না। কোনো শিশু বা তরুণকে সামান্য ভুল, সন্দেহ কিংবা অভিযোগের কারণে নির্যাতনের শিকার হতে দেওয়া হবে না। পরিবার সন্তানকে মানবিক করবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করবে, সমাজ সহিংসতার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে এবং রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে আইনের শাসন। আমাদের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি শুধু বড় রাস্তা, সেতু, ভবন কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়। একটি শিশু কতটা নিরাপদে বেড়ে উঠছে, একজন তরুণ কতটা নিশ্চিন্তে স্বপ্ন দেখছে এবং একজন সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচারের ওপর কতটা আস্থা রাখতে পারছে—সেটিও উন্নত সমাজের গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়।অপ্রতিম ও আজমুলের রক্ত যেন কেবল সংবাদপত্রের পাতায় হারিয়ে না যায়। তাদের মৃত্যু আমাদের বিবেককে জাগিয়ে তুলুক। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলি, যেখানে মানুষের জীবন ও মর্যাদা সবকিছুর ঊর্ধ্বে এবং যেখানে একটি আইফোন বা এক প্লেট ভাতের চেয়ে মানুষের জীবনের মূল্য—সবসময়, নিঃশর্তভাবে—অপরিসীম।

লেখক : কলাম লেখক ও গবেষক
প্রতিষ্ঠাতা : চেয়ারম্যান : জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি
ইমেইল : drmazed96@gmail.com

Share this news as a Photo Card

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রীর মরদেহ উদ্ধার

20 September 2026
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
dailysuprovatsatkhira
www.suprovatsatkhira.com