বিশ্ব আলঝেইমার দিবস
বিশ্ব আলঝেইমার দিবস ২০২৬: স্মৃতির পরিবর্তনকে অবহেলা নয়, সময়মতো ব্যবস্থা নিন
ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
মানুষের জীবনে স্মৃতি শুধু অতীতকে মনে রাখার মাধ্যম নয়; পরিচিত মানুষকে চেনা, দৈনন্দিন কাজ করা, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং নিজের স্বাভাবিক জীবন পরিচালনার সঙ্গেও স্মৃতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে মাঝেমধ্যে কিছু বিষয় ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু ভুলে যাওয়ার প্রবণতা যখন ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে এবং দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করে, তখন সেটিকে শুধু বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।
প্রতিবছর ২১ সেপ্টেম্বর পালিত হয় বিশ্ব আলঝেইমার দিবস। সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব আলঝেইমার মাস। ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক প্রচারণার মূল বার্তা—“আগে জানলে, করণীয়ও বেশি”। অর্থাৎ স্মৃতি, চিন্তা, আচরণ বা দৈনন্দিন কাজে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত রোগ নির্ণয়ের উদ্যোগ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
আলঝেইমার কী
আলঝেইমার মস্তিষ্কের একটি ক্রমশ অগ্রসরমান রোগ। এতে প্রথমদিকে নতুন তথ্য মনে রাখা ও সাম্প্রতিক ঘটনা স্মরণ করার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। সময়ের সঙ্গে ভাষা, চিন্তা, বিচারবোধ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আচরণ এবং দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আলঝেইমার ও ডিমেনশিয়া এক নয়। ডিমেনশিয়া হলো একটি সামগ্রিক অবস্থা, যেখানে বিভিন্ন রোগ বা মস্তিষ্কের ক্ষতির কারণে স্মৃতি ও অন্যান্য চিন্তাশক্তি এতটা কমে যায় যে দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হয়। আলঝেইমার ডিমেনশিয়ার সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলোর একটি।
২০২৬ সালের বৈশ্বিক চিত্র
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ বৈশ্বিক হিসাবে ২০২১ সালে বিশ্বে প্রায় ৫ কোটি ৭০ লাখ মানুষ ডিমেনশিয়া নিয়ে বসবাস করছিলেন এবং প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি নতুন আক্রান্তের ঘটনা ঘটে। আক্রান্তদের ৬০ শতাংশের বেশি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বসবাস করেন।
আলঝেইমার ডিমেনশিয়ার প্রায় ৬০–৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। ২০২৬ সালের যুক্তরাষ্ট্রের আলঝেইমার রোগসংক্রান্ত প্রতিবেদনে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রায় ৭৪ লাখ মানুষ আলঝেইমারজনিত ডিমেনশিয়ায় বসবাস করছেন বলে অনুমান করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে ২০২৬ সালে আলঝেইমার ও অন্যান্য ডিমেনশিয়ার স্বাস্থ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা ব্যয় প্রায় ৪০৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হতে পারে বা প্রায় ৫০ লাখ কোটি টাকারও বেশি। বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান শুধু রোগীর সংখ্যা বা চিকিৎসা ব্যয়ের হিসাব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবার, পরিচর্যাকারী, কর্মক্ষমতা, সামাজিক জীবন এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসেবার বড় একটি বোঝা।
কেন আলঝেইমার হয়
আলঝেইমারের একক কোনো কারণ এখনো নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত হয়নি। বয়স এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। পাশাপাশি বংশগত বৈশিষ্ট্য, মস্তিষ্কের পরিবর্তন এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্য ও জীবনযাপন-সম্পর্কিত বিষয় এতে ভূমিকা রাখতে পারে।
আলঝেইমারে মস্তিষ্কে অ্যামিলয়েড ও টাউ প্রোটিনের অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যায়। এসব পরিবর্তনের সঙ্গে স্নায়ুকোষের স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়া এবং ধীরে ধীরে স্নায়ুকোষের ক্ষতির সম্পর্ক রয়েছে।
কোন কোন বিষয় ঝুঁকি বাড়াতে পারে
সব ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বয়স ও কিছু বংশগত বৈশিষ্ট্য তার উদাহরণ। তবে কিছু ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ডিমেনশিয়ার সম্ভাবনা কমানো বা সূত্রপাত বিলম্বিত করার সুযোগ রয়েছে।
ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে—
* উচ্চ রক্তচাপ * ডায়াবেটিস
* রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল * শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা * ধূমপান * অতিরিক্ত মদ্যপান
* সামাজিক বিচ্ছিন্নতা * শ্রবণশক্তির সমস্যা
* মাথায় আঘাত * বায়ুদূষণ * অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস।২০২৬ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হালনাগাদ নির্দেশিকায় এসব পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
স্বাভাবিক ভুলে যাওয়া নাকি সতর্কসংকেত
কখনো পরিচিত কারও নাম মনে করতে একটু সময় লাগা কিংবা কোথায় কোনো জিনিস রেখেছি তা সাময়িকভাবে মনে না পড়া বয়স বাড়ার স্বাভাবিক অংশও হতে পারে।
কিন্তু একই প্রশ্ন বারবার করা, সদ্য ঘটে যাওয়া ঘটনা ভুলে যাওয়া, পরিচিত জায়গায় পথ হারিয়ে ফেলা, পরিচিত কাজ সম্পন্ন করতে না পারা, হিসাব-নিকাশে অস্বাভাবিক ভুল করা কিংবা ব্যক্তিত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
মূল বিষয় হলো—ভুলে যাওয়ার ঘটনা কতটা ঘন ঘন হচ্ছে এবং তা দৈনন্দিন জীবনে কতটা প্রভাব ফেলছে।
প্রাথমিক লক্ষণ
আলঝেইমারের শুরুতে লক্ষণ অনেক সময় এতটাই মৃদু থাকে যে পরিবারও বিষয়টি সহজে বুঝতে পারে না। উল্লেখযোগ্য লক্ষণগুলো হলো—
* সাম্প্রতিক কথা বা ঘটনা ভুলে যাওয়া
* একই প্রশ্ন বারবার করা
* জিনিসপত্র কোথায় রাখা হয়েছে ভুলে যাওয়া
* পরিচিত জায়গায় পথ হারানো
* সময় ও স্থান সম্পর্কে বিভ্রান্ত হওয়া
* পরিচিত কাজ করতে অসুবিধা
* কথা বলার সময় সঠিক শব্দ খুঁজে না পাওয়া
* হিসাব বা পরিকল্পনায় সমস্যা
* সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা
* পরিচিত মানুষকে চিনতে সমস্যা
* আগের পছন্দের কাজে আগ্রহ হারানো
* ব্যক্তিত্ব ও আচরণে পরিবর্তন
* অস্বাভাবিক উদ্বেগ বা সন্দেহপ্রবণতা।
আলঝেইমার ছাড়াও ডিমেনশিয়ার ধরন
ডিমেনশিয়ার সব ঘটনা আলঝেইমারজনিত নয়। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ধরন হলো—
* রক্তনালিজনিত ডিমেনশিয়া: মস্তিষ্কের রক্তনালির ক্ষতি, রক্তপ্রবাহের সমস্যা বা স্ট্রোকের সঙ্গে সম্পর্কিত।
* লিউই বডি ডিমেনশিয়া: মনোযোগের ওঠানামা, চলাফেরার সমস্যা এবং দৃষ্টিভ্রমের মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
* ফ্রন্টোটেম্পোরাল ডিমেনশিয়া: আচরণ, ব্যক্তিত্ব ও ভাষার পরিবর্তন বেশি স্পষ্ট হতে পারে।কখনো একই ব্যক্তির মধ্যে একাধিক ধরনের ডিমেনশিয়ার বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে দেখা যেতে পারে।
রোগের পর্যায়
প্রাথমিক পর্যায়
স্মৃতি দুর্বল হওয়া, একই কথা বলা, পরিকল্পনায় সমস্যা এবং দৈনন্দিন কিছু কাজে অসুবিধা দেখা দিতে পারে।
মধ্যম পর্যায়
বিভ্রান্তি বাড়ে, পরিচিত মানুষ বা স্থান চিনতে সমস্যা হয় এবং দৈনন্দিন কাজে অন্যের সহায়তা প্রয়োজন হতে শুরু করে।
গুরুতর পর্যায়
কথাবার্তা ও যোগাযোগের ক্ষমতা অনেক কমে যেতে পারে। খাবার খাওয়া, পোশাক পরা, চলাফেরা ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার মতো কাজেও নিয়মিত সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।
শুধু স্মৃতি নয়, আচরণেও পরিবর্তন
অনেক পরিবার আলঝেইমারকে শুধু ভুলে যাওয়ার সমস্যা হিসেবে দেখে। কিন্তু রোগীর আচরণ ও ব্যক্তিত্বেও পরিবর্তন আসতে পারে। অস্থিরতা, বিরক্তি, উদ্বেগ, সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরে যাওয়া বা অস্বাভাবিক সন্দেহপ্রবণতা দেখা দিতে পারে। এসব আচরণকে ইচ্ছাকৃত অবাধ্যতা হিসেবে না দেখে রোগের সম্ভাব্য অংশ হিসেবে বোঝা জরুরি। এতে রোগীর প্রতি পরিবারের আচরণও আরও সহানুভূতিশীল হতে পারে।
রোগ নির্ণয় কীভাবে হয়
শুধু একটি স্মৃতি পরীক্ষার মাধ্যমে আলঝেইমার নিশ্চিত করা যায় না। চিকিৎসক প্রথমে রোগীর উপসর্গ, কখন থেকে শুরু হয়েছে, কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং দৈনন্দিন জীবনে কতটা প্রভাব ফেলছে তা জানতে চান। পরিবারের সদস্যের কাছ থেকেও তথ্য নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
স্মৃতি, মনোযোগ, ভাষা, চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য জ্ঞানীয় পরীক্ষা করা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে অন্য কোনো চিকিৎসাযোগ্য কারণ খোঁজা হতে পারে।
মস্তিষ্কের গঠন ও পরিবর্তন মূল্যায়নে কম্পিউটারাইজড টমোগ্রাফি বা চৌম্বকীয় অনুরণন ইমেজিং করা হতে পারে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আরও উন্নত পরীক্ষাও প্রয়োজন হতে পারে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
স্মৃতির সমস্যা যদি ক্রমশ বাড়তে থাকে, দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত করে, পরিচিত জায়গায় পথ হারানোর ঘটনা ঘটে, হিসাব বা ওষুধ ব্যবস্থাপনায় ভুল বাড়ে অথবা আচরণ ও ব্যক্তিত্বে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দেয়—তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কারণ সব স্মৃতিভ্রংশ আলঝেইমার নয়। কিছু ক্ষেত্রে অন্য চিকিৎসাযোগ্য সমস্যাও এর পেছনে থাকতে পারে।
জটিলতা
রোগ অগ্রসর হলে রোগীর নিজের নিরাপত্তা ও দৈনন্দিন প্রয়োজন সম্পর্কে সচেতনতা কমতে পারে। ফলে পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়া, অপুষ্টি, পানিশূন্যতা, চলাফেরায় অক্ষমতা, সংক্রমণ এবং অন্যের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতার ঝুঁকি বাড়ে।
পরিবারের পরিচর্যাকারীদের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। তাই রোগীর পাশাপাশি পরিচর্যাকারীর সুস্থতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
আলঝেইমারে হোমিওপ্যাথিক ব্যবস্থাপনা
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাদর্শনে রোগীকে শুধু রোগের নাম দিয়ে বিচার না করে তাঁর সামগ্রিক শারীরিক, মানসিক ও ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। আলঝেইমারের মতো দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিসংক্রান্ত সমস্যায় রোগীর বয়স, স্মৃতিশক্তির পরিবর্তনের ধরন, মনোযোগ ও চিন্তাশক্তি, ঘুম, ক্ষুধা-তৃষ্ণা, শারীরিক দুর্বলতা, উদ্বেগ, অস্থিরতা, ভয়, মেজাজের পরিবর্তন, আচরণগত বৈশিষ্ট্য এবং দৈনন্দিন কাজকর্মের পরিবর্তন বিস্তারিতভাবে মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
হোমিওপ্যাথিক ব্যবস্থাপনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা। একই রোগে আক্রান্ত হলেও প্রত্যেক ব্যক্তির উপসর্গ প্রকাশের ধরন, মানসিক অবস্থা ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য ভিন্ন হতে পারে। তাই রোগের নামের ভিত্তিতে সবার জন্য একই ওষুধ নির্ধারণ না করে রোগীর সামগ্রিক উপসর্গচিত্র বিবেচনা করে ওষুধ নির্বাচন করা হয়।
স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যাওয়া, পুরোনো কথা মনে থাকলেও সাম্প্রতিক ঘটনা ভুলে যাওয়া, পরিচিত মানুষ বা জায়গা চিনতে অসুবিধা, মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা, একই কথা বারবার বলা, অস্থিরতা, উদ্বেগ, সন্দেহপ্রবণতা, ঘুমের পরিবর্তন কিংবা আচরণগত অস্বাভাবিকতার মতো উপসর্গের ধরন হোমিওপ্যাথিক মূল্যায়নে বিবেচিত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে রোগীর উপসর্গের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী অ্যানাকার্ডিয়াম, আর্জেন্টাম নাইট্রিকাম, আর্সেনিকাম অ্যালবাম, বেলাডোনা, ব্রায়োনিয়া, ক্যালকেরিয়া কার্বোনিকা, কনিয়াম, জেলসেমিয়াম, ইগনেশিয়া, ল্যাকেসিস, লাইকোপোডিয়াম, মেডোরিনাম, ন্যাট্রাম মিউরিয়াটিকাম, নাক্স ভমিকা, ফসফরাস, পালসেটিলা, সালফার, সেপিয়া, সিলিসিয়া ও থুজা অক্সিডেন্টালিস—এসব ওষুধ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের বিবেচনায় আসতে পারে। তবে কোন রোগীর ক্ষেত্রে কোন ওষুধ উপযোগী হবে, তা শুধু আলঝেইমারের নামের ওপর নির্ভর করে নির্ধারণ করা হয় না। রোগীর পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস, উপসর্গের প্রকৃতি, মানসিক বৈশিষ্ট্য, ঘুম, ক্ষুধা-তৃষ্ণা, আচরণগত পরিবর্তন এবং উপসর্গের ওঠানামা বিবেচনা করে অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক ব্যবস্থাপনা নির্ধারণ করতে পারেন। এ কারণেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক মূল্যায়ন হোমিওপ্যাথিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
আলঝেইমারের ক্ষেত্রে রোগীর মানসিক স্বস্তি ও জীবনযাত্রার মান বজায় রাখতেও পারিবারিক পরিচর্যার গুরুত্ব রয়েছে। নিয়মিত ঘুম, পরিমিত ও পুষ্টিকর খাবার, উপযুক্ত শারীরিক ও মানসিক সক্রিয়তা, পরিচিত পরিবেশ, নিয়মিত দৈনন্দিন রুটিন এবং পরিবারের সদস্যদের ধৈর্যশীল সহযোগিতা রোগীর সামগ্রিক পরিচর্যায় সহায়ক হতে পারে।
হোমিওপ্যাথিক ব্যবস্থাপনা গ্রহণের ক্ষেত্রে রোগীর চলমান চিকিৎসা ও চিকিৎসকের পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। আলঝেইমার নির্ণয় বা চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-পর্যবেক্ষণ বাদ দেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে স্মৃতিশক্তির দ্রুত অবনতি, আচরণে বড় ধরনের পরিবর্তন, দৈনন্দিন কাজ করতে অক্ষমতা কিংবা নতুন কোনো শারীরিক উপসর্গ দেখা দিলে যথাযথ চিকিৎসকের মূল্যায়ন জরুরি।
হোমিওপ্যাথিক ওষুধ নিজে থেকে নির্বাচন বা সেবন না করে রোগীর সামগ্রিক উপসর্গ ও প্রয়োজন বিবেচনায় অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই উত্তম। রোগীর নিরাপত্তা, মানসিক স্বস্তি, দৈনন্দিন সক্ষমতা এবং জীবনযাত্রার মানকে সামনে রেখে ব্যক্তিকেন্দ্রিক হোমিওপ্যাথিক ব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-পর্যবেক্ষণ ও পারিবারিক পরিচর্যার সমন্বয়ই হওয়া উচিত দীর্ঘমেয়াদি যত্নের ভিত্তি।
পরিবারের করণীয়
আক্রান্ত ব্যক্তিকে ভুলের জন্য বারবার বকাঝকা করা উচিত নয়। শান্তভাবে কথা বলা, পরিচিত পরিবেশ বজায় রাখা এবং দৈনন্দিন কাজের একটি সহজ রুটিন তৈরি করা সহায়ক।
ঘরের ঝুঁকিপূর্ণ স্থান নিরাপদ করা, প্রয়োজনীয় জিনিস নির্দিষ্ট স্থানে রাখা এবং রোগী বাইরে গেলে নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে পরিচর্যাকারীর বিশ্রাম ও মানসিক সহায়তার প্রয়োজনও উপেক্ষা করা যাবে না।
ঝুঁকি কমাতে জীবনযাপন
মস্তিষ্কের সুস্থতা বজায় রাখতে নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম এবং সামাজিক ও মানসিকভাবে সক্রিয় থাকা গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও রক্তের কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান পরিহার, শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তির সমস্যা হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া এবং মাথায় আঘাত এড়ানোর চেষ্টা করাও গুরুত্বপূর্ণ।২০২৬ সালের তথ্য ও সচেতনতা কার্যক্রমে একটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে এসেছে—রোগ নির্ণয় শুধু রোগের নাম জানার বিষয় নয়; এর মাধ্যমে চিকিৎসা, পরিচর্যা, সহায়তা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার পথও খুলে যায়।
পরিশেষে বলা যায়, আলঝেইমার শুধু স্মৃতি হারানোর রোগ নয়; এটি ধীরে ধীরে মানুষের চিন্তা, আচরণ, যোগাযোগ, স্বনির্ভরতা ও পারিবারিক জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে। আবার প্রতিটি ভুলে যাওয়া আলঝেইমারের লক্ষণও নয়। তাই অস্বাভাবিক ও ক্রমবর্ধমান পরিবর্তন দেখা দিলে ভয় না পেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।বিশ্ব আলঝেইমার দিবস ২০২৬-এর বার্তা হোক—স্মৃতির পরিবর্তনকে অবহেলা নয়, সময়মতো শনাক্তকরণ; রোগীকে একা নয়, সহমর্মিতা ও নিরাপদ পরিচর্যার সঙ্গে পাশে থাকা। কারণ আগে জানা গেলে, করণীয়ও বেশি।
লেখক : কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক
প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান : জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি
ইমেইল : drmazed96@gmail.com

Leave a Reply