স্থায়ী আশ্রয় ও জমির মালিক হতে যাচ্ছে বুড়িগোয়ালীনির আশ্রয় কেন্দ্রের ভূমিহীনরা
স্থায়ী আশ্রয় ও জমির মালিক হতে যাচ্ছে বুড়িগোয়ালীনির আশ্রয় কেন্দ্রের ভূমিহীনরা
শ্যামনগর ব্যুরো:
সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের কলবাড়ী, বুড়িগোয়ালিনী ও পানখালী চুনা আশ্রয়ণ প্রকল্প। এখানে বহু বছর ধরে মিলেমিশে বাস করছে ৫০টি পরিবার। বৈচিত্র্যময় এই জনপদে যেমন আছেন সনাতন ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ, তেমনই আছেন উপকূলের প্রান্তিক জেলে এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী মুন্ডা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা। কিন্তু এই পরিবারগুলোর ভেতরের জীবনযাত্রা মোটেও সহজ নয়। এদের সবার জীবনের সবচেয়ে বড় সংকট ছিল— মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার, তথা স্থায়ী বাসস্থানের নিশ্চয়তা।
উপকূলীয় এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মসংস্থানের তীব্র অভাব। বেঁচে থাকার তাগিদে এবং জীবিকার টানে বছরের একটা দীর্ঘ সময় এই মানুষদের বাধ্য হয়ে চলে যেতে হয় দূর-দূরান্তের ইটভাটা কিংবা অন্য কোনো শ্রমসাধ্য কাজে। আর ঠিক এখানেই ওত পেতে থাকত বড় বিপত্তি। জীবিকার খোঁজে যখনই তারা ঘর ছাড়তেন, তখনই শূন্য সুযোগ বুঝে অন্য কেউ এসে দখল করে নিত তাদের মাথা গোঁজার একমাত্র ঠাঁইটুকু। স্থায়ী ঠিকানা বা ঘরের অনুকূলে কোনো বরাদ্দপত্র কিংবা দলিল না থাকায়, তারা যেমন ঘরের ওপর আইনি অধিকার দাবি করতে পারতেন না, তেমনই বঞ্চিত হতেন সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন মৌলিক সুযোগ-সুবিধা থেকে। সামান্য কয়েকজন পরিবার যাদের দলিল আছে, তারা কিছু সুবিধা পেলেও সিংহভাগ পরিবারই বাস করছিলেন এক চরম অনিশ্চয়তায়।
এই ৫০টি পরিবারের দীর্ঘদিনের নীরব কান্না ও উচ্ছেদ আতঙ্ক নজরে আসে উপকূলীয় এলাকার উন্নয়ন ও অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন উপকূলীয় শিক্ষা জীববৈচিত্র্য সংস্থা (সিডিও)-র। সিডিও-র কর্মীরা সরাসরি আশ্রয়ণ প্রকল্পের মানুষের দোরগোড়ায় যান এবং তাদের এই মানবিক সংকটের কথা শোনেন। সমস্যা অনুধাবন করে সিডিও প্রথম দফায় বুড়িগোয়ালীনি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের সাথে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে।
এরপর সকলের মতামত ও অংশগ্রহণের ভিত্তিতে ‘সিডিও সুন্দরবন কোয়ালিশন’-এর আওতায় এবং ‘লোকালি লিড ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন’ (LLDRR) প্রকল্পের মাধ্যমে বুড়িগোয়ালিনী পানখালী চুনা আশ্রয়ণ প্রকল্পে একটি বিশেষ মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। উক্ত সভায় উপস্থিত ছিলেন বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী নজরুল ইসলাম, সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের মেম্বারবৃন্দ এবং ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নায়েব গগন বাবু। এই স্থানীয় সভায় প্রকৃত বসবাসকারীদের সত্যতা নিশ্চিত করা হয় এবং বর্তমান বাসিন্দাদের একটি সঠিক তালিকা তৈরি করে ইউনিয়ন ভূমি অফিসে জমা দেওয়া হয়। স্থানীয় পর্যায়ে সমস্যাটি চিহ্নিত হওয়ার পর, সিডিও সুন্দরবন কোয়ালিশনের উদ্যোগে শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কার্যালয়ের হলরুমে আরেকটি উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় অংশ নেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার শামসুজ্জাহান কনক, সহকারী কমিশনার-ভূমি রাশেদ হোসাইন, উপজেলা সমাজসেবা অফিসার, বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী নজরুল ইসলাম, সিডিও-র নির্বাহী পরিচালক আল ইমরান এবং আশ্রয়ণ প্রকল্পভুক্ত বাসিন্দাবৃন্দ।
সভায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের প্রতিনিধিরা অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে উপজেলা প্রশাসনের সামনে তাদের দলিলহীনতার কষ্ট ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার কথা তুলে ধরেন। তাদের এই মানবিক সংকট মনোযোগ দিয়ে শোনেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার শামসুজ্জাহান কনক। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষায় আশ্বস্ত করেন এবং এসিল্যান্ড অফিসারকে সমস্যাটি স্থায়ীভাবে সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নির্দেশনার পর কাজের গতি বহুগুণ বেড়ে যায়। এসিল্যান্ডের নির্দেশনায় ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নায়েব বুড়িগোয়ালিনী ও পানখালী চুনার বর্তমান বাসিন্দাদের তালিকা প্রস্তুত করে এসিল্যান্ড কার্যালয়ে পাঠান। সেখান থেকে যাচাই-বাছাই শেষে ফাইলটি পাঠানো হয় জেলা প্রশাসক (ডিসি) কার্যালয়ে। জেলা প্রশাসক মহোদয় বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নেন এবং শুধু এই দুটি প্রকল্পই নয়, বরং বুড়িগোয়ালীনি ইউনিয়নের যতগুলো আশ্রয়ণ প্রকল্প রয়েছে, সেগুলোতে বসবাসরত সকল মানুষের পূর্ণাঙ্গ তালিকা পরিবর্তনের নির্দেশ দেন। জেলা প্রশাসকের সেই নির্দেশনা অনুযায়ী বর্তমানে ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে সকল আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করে পুনরায় এসিল্যান্ড অফিসে পাঠানো হয়েছে। যার ফলে উপকূলের এই ভাগ্যবঞ্চিত মানুষগুলোর দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন এখন বাস্তবে রূপ নিতে চলেছে। তারা পেতে যাচ্ছেন নিজেদের ঘরের আইনি অধিকার, হতে যাচ্ছেন জমির প্রকৃত মালিক। সিডিওর কার্যকর মধ্যস্থতা এবং উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের এই মানবিক ও ইতিবাচক ভূমিকার কারণেই আজ নিশ্চিত হতে যাচ্ছে বুড়িগোয়ালীনির ৫০টি পরিবারের স্থায়ী মাথা গোঁজার ঠাঁই। দলিল বা বরাদ্দের কাগজ হাতে পেলে চিরতরে অবসান ঘটবে উচ্ছেদ আতঙ্কের, নিশ্চিত হবে প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠীর মৌলিক মানবাধিকার।

Leave a Reply