সাতক্ষীরা আ’লীগ: ‘হাইব্রিড’ নেতাদের চাপে ত্যাগিরা কোণঠাসা
আহাসানুর রহমান রাজীব:
সংকট কাটিয়ে সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগ আগের চেয়ে অনেক সুসংগঠিত হলেও দলে এখনো রয়েছে ঢের সমস্যা। দীর্ঘদিন একটানা রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ গ্রæপিং ও দ্ব›দ্ব এখন অনেকটা প্রকাশ্য রুপ নিয়েছে। এ জেলায় হাইব্রিড নেতাদের চাপে প্রকৃত ত্যাগি অনেক নেতার এখন কোণঠাসা।
আজ ২৩ জুন ৭০ বছরে পা রাখছে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম রাজনৈকিত দল আওয়ামী লীগ। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা ছিল বাস্তবতা আর বিশেষ আদর্শের ভিত্তিতে। বারবার হোঁচট খেয়ে দলটি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এখন যতটুকু শক্তিশালী, তা যে কোনো রাজনৈকিত দলের জন্য ঈর্ষণীয়। শেখ হাসিনা দীর্ঘ ৩৮ বছর নেতৃত্ব দিয়ে যেমন দলটিকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছেন, তেমনি চারবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়ে বাংলাদেশকেও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশত বছরে এসে বাংলাদেশ এখন হাজারও উন্নয়নের গল্পের কথা বলে।
যতদূর জানা যায়, তৎকালীন মহাকুমা সাতক্ষীরায় আওয়ামী লীগে যাত্রা শুরু হয় ১৯৫৪ সালে। সে সময়ের সভাপতি ছিলেন রসুলপুর গ্রামের শহীদ খান ও সাধারণ সম্পাদক সুলতানপুর গ্রামের শেখ শরিফ আহম্মেদ। এরপর ১৯৭০ সালে নেতৃত্বে আসেন সৈয়দ কামাল বখত্ সাকি ও অ্যাড: এ এফ এম এনতাজ আলী। ১৯৮০ সালে সম্মেলনের মাধ্যমে সভাপতি নির্বাচিত হন সৈয়দ কামাল বখত্ সাকি ও সাধারণ সম্পাদক মুনসুর আহম্মেদ। তারাই ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত দলটির নেতৃত্ব দেন। সৈয়দ কামাল বখত্ সাকি আমৃত্যু জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। ২০০০-২০০৫ আহবায়ক ছিলেন। ২০০৫ সালে সম্মেলনের মাধ্যমে সভাপতি নির্বাচিত হন ইঞ্জিনিয়ার শেখ মুজিবুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম। সবশেষ সম্মেলন হয় ২০১৫ সালের ৭ ফেব্রæয়ারি। পরিবর্তন আসে শুধু সভপতি পদে। বর্তমান সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগ চলছে মুনসুর আহম্মেদ ও নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে।
তবে দীর্ঘ দিন রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ গ্রæপিং ও দ্ব›দ্ব এখন অনেকটা প্রকাশ্য রুপ নিয়েছে। অন্য দল থেকে আসা এবং নব্য হাইব্রিড নেতাদের চাপে প্রকৃত ত্যাগি অনেক নেতা এখন কোণঠাসা। স্বাধীনতার পর থেকে সাতক্ষীরার বেশিরভাগ সংসদীয় আসন বিরোধীদের দখলে ছিল। গেল সংসদ নির্বাচনে অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে ঐক্যবদ্ধভাবে নৌকার বিজয়ে কাজ করেছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। কিন্তু এর কিছুদিন পরেই উপজেলা নির্বাচন বেশ বিপাকে পড়ে দলটি। বেশিরভাগ উপজেলায় প্রতিদ্ব›িদ্বতা শুধু আওয়ামী লীগই করছে। প্রার্থী হয়েছে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ। দুই উপজেলায় নৌকার বিপক্ষের প্রার্থী হয়ে বিজয়ী হয়েছে। এসব প্রার্থী ক্ষমতাসীন দলের নেতা। সে সময় নিজেরদের মধ্যে সংঘর্ষে জড়িয়েছেন অনেক নেতা।
এ বিষয়ে জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও পৌর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী আক্তার হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর অনেক ত্যাগী নেতার কোন মূল্যায়ন হয়নি। হাইব্রিড নেতারাই এখন দলকে নিয়ন্ত্রণ করছে। দীর্ঘদিন বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কোন সম্মেলন হয়নি। কয়েক নেতা বছরের পর বছর দলীয় পদ ধরে রেখেছেন। এসব কারণে নতুন নেতৃত্ব গড়ে উঠছে না। তাই প্রতিটি কমিটিতে অন্তঃকোন্দল ও গ্রæপিং এখন প্রকাশ্যে। ভূঁইফোঁড় বিভিন্ন সংগঠনের পেছনে ‘লীগ’ শব্দ যুক্ত করে আওয়ামী লীগকে বিতর্কিত করছে। তাছাড়া গেল বিশ বছর জেলায় আওয়ামী লীগের কোন দলীয় কার্যালয়ই নেই।
জেলা আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক হারুর-উর-রশিদ জানান, সংকট কাটিয়ে সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগ এখন আগের চেয়ে অনেক সু সংগঠিত। বড় দলে বিরোধ থাকাটা স্বাভাবিক। তবে আলোচনার মাধ্যমে অনেক সমস্যার সমাধান করা হয়েছে। বিভিন্ন ইউনিটে সম্মেলনের মধ্য দিয়ে নতুন নেতৃত্ব এনে এই পরিস্থিতি অনেকাংশে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শেখ সাহিদ উদ্দিন বলেন, জেলা আওয়ামী লীগ এখন সু সংগঠিত। তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে সম্মেলনের মাধ্যমে জেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত হয়েছে। আমাদের কিছু সহযোগী সংগঠনে দীর্ঘদিন কোন সম্মেলন হয়নি। পর্যায়ক্রমে এসব ইউনিটের সম্মেলন করে নতুন কমিটি করা হবে।
সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ এখন যে কোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী এবং গণমুখী। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাই পেয়েছে তৃণমূলের রাজনীতির মধ্য দিয়ে। আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে বিশেষ প্রেক্ষাপটে এবং আদর্শের ভিত্তিতে। একটি দল জন্মের দুই দশকের মাথায় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যেমে একটি স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। তবে যুগের সাথে তাল মেলাতে ৭০ বছরের আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে বিশেষ কিছু পরিবর্তনও এসেছে। সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগ আগের চেয়ে এখন অনেক সুসংগঠিত।
এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য একাধিকবার যোগাযোগ করা হয় জেলা সভাপতি মনসুর আহমদ ও সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলামের সাথে। মিটিঙে ব্যস্ততার কারণ দেখিয়ে তারা কথা বলতে রাজি হননি।

Leave a Reply