ঢাকাFriday , 24 May 2019
  1. Mobile Phones
  2. Photography
  3. Video
  4. অনলাইন
  5. অপরাধ
  6. আন্তর্জাতিক
  7. আশাশুনি
  8. ইসলাম
  9. উন্নয়ন
  10. উপকূল
  11. এক্সক্লুসিভ
  12. এনজিও
  13. কয়রা
  14. কলাম
  15. কলারোয়া

আইলার ১০ বছর : ঝড় ঝপটার কথা শুনলে বুকটা কেঁপে ওঠে

admin ঢাকা
আপডেট: 24 May 2019, 22:49

শাহিন বিল্লাহ
ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদী ভাঙন- এসব জন্মের পর থেকে দেখে দেখে বড় হয়েছি। কিন্তু মনের মধ্যে দাগ কেটে দেওয়া দুর্যোগ হলো প্রলয়ঙ্কারী জলোচ্ছ্বাস আইলা।
২০০৯ সালের মে মাসের ২৫ তারিখ, সোমবার। বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছে। আবহাওয়া তেমন একটা ভালো না। আকাশে মেঘের ঘনঘটা আর মাঝে মাঝে গর্জনের সাথে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে।
সময় আনুমানিক সকাল নয়টা কিংবা দশটা হবে। গ্রামে মাইকিং করে সর্তকতা সংকেত ঘোষণা করছে। বাড়ির পাশের নদীর ধারে বাজার, সেখানে শত শত মানুষ একত্রিত হয়ে কেউ ঘোষণা শুনছে, আবার আলাপ আলোচনাতে ব্যস্ত অনেকে।
আমি বাড়ি থেকে বাজারে এসে দেখি নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে; সঙ্গে হালকা বাতাস আর বৃষ্টি। সর্তক সংকেত শুনে গ্রামের মানুষের মনে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছে। অনেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গোছাতে ব্যস্ত। আবার যাদের বাড়ি ঘরের অবস্থা খরাপ তারা আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে রওনা দিয়েছে।
এসব ঘুরে ঘুরে দেখছি। আমার বয়স তখন আট নয় বছর হবে। খুব ভালো বুঝি তা না। শহর থেকে আতাউর কাকু এসেছেন ক্যামেরা নিয়ে, ভিডিও করছেন, ছবি তুলছেন। তার পিছু পিছু ঘুরছি, দেখছি, এরমধ্যে খবর এলো অন্য একটি এলাকার বেড়িবাঁধ ভেঙে নদীর পানি গ্রামে প্রবেশ করছে। সবাইকে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার জন্য বলা হচ্ছে।
এক এক করে কয়েকটি স্থান ভেঙে যাওয়ার খবর আসছে। এলাকা প্লাবিত হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় নির্দিষ্ট স্থানে যাওয়ার জন্য এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থান ত্যাগ করার জন্য বলা হচ্ছে।
হঠাৎ আমার ফুফু এসে আমাকে হাত ধরে নিয়ে টানতে টানতে বাড়ির দিকে নিয়ে গেলেন। ওদিকে নাকি বাড়ির সবাই আমাকে খুঁজছে। ফুফু আমাকে বকছেন আর বলছেন, তোকে কখন থেকে খুঁজছি, কোথাও পাচ্ছি না, এখনি বাড়ি চল।
তখন আনুমানিক বেলা ১টা বা ২টা বাজে। বাড়িতে এসে দেখি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সব গুছিয়ে বস্তা বন্দী করা শেষ। পানির শা শা শব্দ শুনতে পাচ্ছি। সবাই আতঙ্ক আর ভয়ে কাঁপছে, কী করবে কেউ তা বুঝতে পারছে না। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার চোখে সামনে পানি বাড়ির উঠানে চলে এলো, তারপর বারান্দায় এবং ধীরে ধীরে ঘরে প্রবেশ করতে লাগল।
বড়রা খাটের চার পায়ে ইট দিয়ে উঁচু করতে লাগলেন। এরমধ্যে অবস্থা ভয়াবহ দেখে আমার দাদীকে পাশের একটি দুইতলা বাড়িতে রেখে আসেন। বাড়ির সবাই বাড়িতে থাকার জন্য শেষ চেষ্টা টুকু করছে। কিন্তু তা আর সম্ভব হয়নি। এক সময় ঘরের পানির উচ্চতা খাটকে ছাপিয়ে যায়, তখন আর বাড়িতে থাকা সম্ভব হলো না। সিদ্ধান্ত হলো পাশের দুইতলা একটি বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া হবে।
সবাই হেঁটে গেলেও পানি এত বেশি যে আমাকে সাঁতরে পার হতে হলো। আমি মায়ের আঁচল ধরে সাঁতরে প্রতিবেশীর বাড়িতে গেলাম। দুই তলাতে মোট দুইটা কক্ষ, সেখানে আমাদের আগেই অনেকে এসে আশ্রয় নিয়েছে।

সন্ধ্যা থেকে প্রকৃতি ভয়াবহ আকার ধারণ করল। যেমন ঝড় হচ্ছে, তেমন বৃষ্টি। আশ্রয় নেওয়া বাড়িটির নিচতলা পানিতে ভরে গেল। বাড়িটি একটু পুরাতন। ঢেউয়ের আঘাতে কেঁপে কেঁপে উঠছিল। আর তখন সবাই জোরে চিৎকার করে কেঁদে উঠছিল। সে কী ভয়াবহ অবস্থা!
একটি রুমের খাটের নিচে আমাকে শুইয়ে দেওয়া হলো। গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছি। অন্যের পা আমার শরীরের উপর আমার পা কার শরীরে বুঝতে পারছিলাম না।
সেই রাতে ছোট একটি কলস, পানি ভাগ করে খেতে হয়েছিল সবাইকে। তারপরের অনেক দিন শুকনো চিড়া আর মুড়ি খেয়ে থাকতে হয়েছে। মানুষ দুর্যোগে কতটা অসহায় তা সে দিনের কথা মনে হলে বুঝতে পারি। সকাল বেলা মানুষ তার চিরচেনা গ্রামকে চিনতে পারছে না। ঘর বাড়ি, গাছ পালা ভেঙে পড়ে আছে। পশু পাখি মরে ভেসে আছে পানিতে।
যতদূর চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। কিন্তু খাওয়ার জন্য বিন্দু পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি নেই। ভাটার কারণে পানি কমে যখন বুক থেকে হাঁটুতে নামল সবাই নিজ নিজ বাড়িতে চলে গেল। আমরাও বাড়িতে যাওয়ার পর বাড়ির ক্ষতিগ্রস্ত অংশ কিছুটা ঠিক করলাম।
অসংখ্য মানুষ অসুস্থ হতে শুরু করেছে, তার মধ্যে ডায়রিয়া আর কলেরা বেশি। আমার এক বন্ধুর বাবা মারা যায় দুই দিনের মাথায়। সারা গাঁইয়ে পানি। তাকে কবর দেওয়ার জায়গা পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে তাকে সমাহিত করা হয় নদীর চরের উঁচু একটি জায়গায়। পাশের গ্রামের অনেক নারী, শিশু, বৃদ্ধ আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার পথে ভেসে যায়। চারদিকে মাছ, সাপ, পশু পাখি মরে ভেসে আছে। সেই পানি গায়ে লাগলেই চুলকানি শুরু হচ্ছে। সেই সময় খাটের উপর ইট দিয়ে চুলা তৈরি করে শুধু ভাত রান্না করে খেয়েছি অনেক দিন। জোয়ারের সময় খাটের উপর পরিবারের সবাই মিলে বসে থাকতে হতো আবার জোয়ার চলে গেলে নিচে নেমে কাজ সেরে আবার জোয়ার আসার আগে খাটের উপর উঠতে হতো। জীবনটা যেন খাটের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
কয়েক দিনের মধ্যে সরকারি বা বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা ত্রাণ দিয়ে সহায়তা করেছিল আর এলাকাবাসীর স্বেচ্ছাশ্রমে এলাকার বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট বাঁধ দিয়ে কিছুটা রেহাই হয়। কিন্তু সম্পূর্ণ বাঁধ দিতে দুই বছরের বেশি সময় লেগে যায়।
শিক্ষা, অর্থনীতি, প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য সব কিছু থেকে পিছিয়ে যায় আমাদের জনপদটি। সে দিনের কথা মনে হলে মনটা আঁতকে ওঠে। আর একটা কথা ভাবি, যদি রাতের বেলা বেড়ি বাঁধ ভেঙে পানি আসত তাহলে গ্রামের মাটির ঘর চাপা পড়ে মারা যেত অসংখ্য মানুষ। আইলার ১০ বছর পার হয়ে গেলেও এখনও সুন্দরবন উপকূলীয় মানুষের জন্য টেকসই বেড়ি বাঁধ নির্মাণ করা হয়নি। তাই ঝড় ঝপটা আর জলোচ্ছ্বাসের কথা শুনলে বুকটা কেঁপে ওঠে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *