রণাঙ্গনের গল্প: রাজাকার বাহিনীর ১২৬ জন আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে
মঈনুল আমিন মিঠু: তালা উপজেলার নগরঘাটা ইউনিয়নের গাবতলা গ্রামের মো. নুর আলী সরদার ১৯৭১ সালে দেশ মাতৃকার টানে অংশ নেন মহান মুক্তিযুদ্ধে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা নুর আলী সরদার ১৯৭১ সালে এপ্রিল মাসের ১৬ তারিখে ভারতের বসিরহাট আকাশবাণী ক্যাম্পে মুক্তিবাহিনীতে নাম লেখান। সেখান থেকে যান তকিপুর ক্যাম্পে। ১৭ দিনের ট্রেনিং শেষে চলে যান বিহারে। সেখানে এক মাস ১৭ দিন ট্রেনিংয়ে এসএলআর, এসএমজি, এলএমজি, রকেট লাঞ্চার এন্টি পার্সোনাল টুইচ মর্টার ও থ্রিস মর্টার পরিচালনার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ট্রেনিং শেষে কল্যাণী ফিরে অস্ত্র নিয়ে চলে আসেন হাকিমপুরে। তারপর অংশ নেন একাধিক সম্মুখ যুদ্ধে।
মুক্তিযোদ্ধা নুর আলী সরদার যুদ্ধকালীন বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরে সুপ্রভাত সাতক্ষীরাকে জানান, ভোমরা, কাকডাঙ্গা, বালিয়াডাঙ্গা, মাধবকাটি ও দমদম ব্রিজ বোমা দিয়ে উড়িয়ে দেই। বালিয়াডাঙ্গা যুদ্ধে সঙ্গী হিসেবে তোফায়েল আহমেদ, সেলিম দারোগা, দিলীপ, আমতলার কাদের, রাজনগরের সামসুর, কালাম ও কলারোয়ার মোসলেমসহ আরো অনেকে ছিলেন। সেখান থেকে তোফায়েল আহমেদসহ সুবেদার আমানুল্লাহকে ধরে নিয়ে যায় রাজাকার বাহিনী। রাজাকারদের হাত থেকে তাদের উদ্ধার করতে না পারলেও দেশ স্বাধীনের পরে তাদেরকে যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে উদ্ধার করা হয়। বালিয়াডাঙ্গা যুদ্ধ চলে তিন দিন ধরে। যুদ্ধকালীন সময়ে সেখানে কতজন মুক্তিযোদ্ধা মারা গিয়েছিলেন সঠিক তথ্য জানা নেই। তবে সেখান থেকে খানদের পাকড়াও করেন মুক্তিযোদ্ধারা। বালিয়াডাঙ্গা যুদ্ধ এমনই ছিল যে যুদ্ধ শেষে পাকিস্তানি সেনাদের লাশ ট্রাক ভরে নিয়ে যেতে হয়। অনেক লাশ মুক্তিযোদ্ধারা সোনাই নদীতে ভাসিয়ে দেয়। এরমধ্যে একদিন ১৪৫ জন এর সদস্য নিয়ে ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমানের নির্দেশে ভোমরায় যুদ্ধ শুরু করি। সেখানে দুই দিন যুদ্ধ শেষে ২২ জন মুক্তিযোদ্ধা ফিরে আসেন, বাকি ১২৩ জন শহীদ হন। তারপর একদিন সাতকানিয়া-বাঁশখালীতে সেলিম দারোগার সাথে গ্রুপ করে যুদ্ধ শুরু করি। বাসঘাটার মোড়ে বিদ্যুৎ সংযোগ ও টেলিফোন লাইনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করি। সেখানে শহীদ হন নারায়ণ গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক। আর গুরুতর আহত হয়ে নিজের পুরুষাঙ্গ হারান বীর মুক্তিযোদ্ধা মিজান। আমতলার কাদের ও আমি মিজানকে তলুইগাছা রয়েল বিশ্বাসের বাড়িতে নিয়ে যায়, সেখান থেকে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতে পাঠিয়ে দেই। ১৯৭১ সালের ৫ ডিসেম্বর সোমবার রাত দশটায় কপিলমুনি বাজারে রাজাকার বাহিনীর আস্তানায় হানা দেই। ৯ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার সকাল দশটায় কপিলমুনি থেকে রাজাকার বাহিনীর ১২৬ জন আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে।
বেদনার স্মৃতি মনে করে তিনি বলেন, ক্যাপ্টেন শফিকুল্লাহ আমাদের মনিরামপুরে যুদ্ধ করার জন্য নির্দেশ দেন। সেখানে যুদ্ধকালীন সময়ে মর্টারের গুলিতে ছয়জন, আর ওজলপুর রাজাকার বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন আরো চারজন ইপিআর। এটা আমাদের খুব খারাপ লাগে।
কেমন বাংলাদেশ দেখতে চান- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরে বর্তমানে বাংলাদেশে উন্নয়নের যে ধারা চলছে- সেটা অব্যাহত রাখতে হবে। তিনি বলেন, বর্তমান বাংলাদেশ আগের তুলনায় এখন অনেক উন্নত, এভাবেই এগিয়ে যাক বাংলাদেশ।
Leave a Reply