রণাঙ্গনের গল্প: ‘দাদা বাড়িতে সংবাদ দেবেন দেশের জন্য মারা যাচ্ছি’
গাজী আসাদ: বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ সুভাষ সরকার। সাতক্ষীরা সিটি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ সুভাষ সরকার বর্তমানে থাকেন সাতক্ষীরা পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের উত্তর কাটিয়া গ্রামে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় থাকতেন গ্রামের বাড়ি তালা উপজেলার নগরঘাটা ইউনিয়নের গোয়ালপোতা গ্রামে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স ১ম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে তাদের গ্রামে গণহত্যা চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। যা গোয়ালপোতা-হরিণখোলা গণহত্যা নামে পরিচিত। গণহত্যা চালানোর সময় পরিবারসহ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগণা জেলার গাইঘাটা থানার গোপালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেন তিনি। তারপর বাড়ির কাউকে না জানিয়ে অংশ নেন মহান মুক্তিযুদ্ধে।
মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরে এই গেরিলা কমান্ডার সুপ্রভাত সাতক্ষীরাকে বলেন, ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার পর সিদ্ধান্ত নেই মুক্তিযুদ্ধে যাবো। বাড়ির কাউকে না জানিয়ে চলে যায় বসিরহাটে গফুর সাহেবের নেতৃত্বাধীন রিক্রুটিং ক্যাম্পে। সেখান থেকে তাকেসহ আরো কয়েক জনকে গাড়িতে করে পাঠিয়ে দেওয়া হয় টাকি সীমান্তের তকিপুর ক্যাম্পে। সেখানে মেজর জলিলের নেতৃত্বে সুবেদার আয়ুব ও শাহাজান মাস্টার তাদের ১৮ দিনের রাইফেল, গ্রেনেড, আহত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাথমিক চিকিৎসা, যুদ্ধের কৌশল, জনগণকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আনার উপায়সহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেন। এই ক্যাম্পে তাদেরকে সাহস জোগাতে প্রায়ই স্বাধীন বাংলার শিল্পী ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবীরা আসতো। ট্রেনিং শেষে তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হয় ভারতের বিহারের চাকুরিয়ায় দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে ব্যবহৃত একটি পরিত্যক্ত ক্যাম্পে। বিশাল এই ক্যাম্পে গিয়ে দেখি তারাসহ ৬ প্লাটুন মুক্তিযোদ্ধা আনা হয়েছে। প্রতি প্লাটুনে একশ জনের মত মুক্তিযোদ্ধা ছিলো। সেখানে আগে থেকে টানানো তাবুতে চারজন করে ছিলাম। এই ক্যাম্পে তাদের মূলত গেরিলা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সেখানে বিভিন্ন অস্ত্রের নাম ও তার ব্যবহার, অস্ত্র খোলা ও পরিষ্কার করা, এসএমজি, এসএলআর, এলএমজির ব্যবহার, কিভাবে গ্রেনেডে তৈরী করতে হয়, লক করতে হয়, লক ছাড়াতে হয়, গ্রেনেড ছোড়ার পর নিরাপদ দূরত্ব নির্ধারণ, মাইন অপসারণ, রকেট লান্সার দিয়ে বিমান ধ্বংসের কৌশলসহ প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা, বিনা অস্ত্রে প্রতিপক্ষের সাথে যুদ্ধ করার কৌশল, দড়ি দিয়ে পাহাড় ও উচ্চ ভবনে উঠার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সেখানে প্রশিক্ষণ শেষে ভারতের নদিয়ার কল্যাণী হেড কোয়াটারে নিয়ে আসা হয়। হেড কোয়াটার থেকে কাকে কোথায় যেতে হবে সেটা নির্ধারণ করা হয়। তাকেসহ কয়েক জনকে বসিরহাটের ইটিন্ডা ক্যাম্পে ১৫ দিন বিএসএফ এর সঙ্গে সীমান্তের বাংকারে অস্ত্র নিয়ে পাহারা দেন। সীমান্তের খালের ওপার তারা এবং এপারে পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থান ছিলো। মাঝে মাঝে দু’দলের মধ্যে গুলি বিনিময় হতো।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গেরিলা কমান্ডার সুভাষ সরকার আরও বলেন, একদিন আমাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় বৈকারী সীমান্তে পাকিস্তানিদের পুতে রাখা মাইন অপসারণের জন্য। সেখানে মাইন অপসারণের সময় অসাবধানতাবশত আমাদের এক সহযোদ্ধার পা উড়ে যায়। সে এক করুণ দৃশ্য। আমরা তার পায়ে গামছা বেঁধে দিয়ে রক্তক্ষরণ বন্ধ করি। তারপর কাজ অসমাপ্ত রেখে তাকে ভারতে নিয়ে যায়। এরপর বসিরহাট থেকে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় হাকিমপুরে। সেখান থেকে ক্যাপ্টেন মাহবুব আমাদের দায়িত্ব দেন যশোরের নওয়াপাড়া ট্রেন লাইন ধ্বংস করার। আমার নেতৃত্বে পাঁচ জন মুক্তিযোদ্ধা বৃষ্টির সময় কাঁদা-মাটি পাড়ি দিয়ে নওয়াপাড়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেই। কিন্তু যাওয়ার পথে মঙ্গলকোট গ্রামে বাঁধাগ্রস্ত হই। গ্রামবাসীর অসহযোগিতায় আমরা আমাদের লক্ষ্যে এগোতে পারিনি। তবে ফিরে আসার সময় একটা কালভার্ট ও একটা পোস্ট অফিস ধ্বংস করি এবং ক্যাম্পে ফিরে আসি। আর ফিরে আসার পর মূল কাজ করতে না পারায় ভৎসনার শিকার হই। এর কয়েক দিন পর আমাদের নিজ নিজ গ্রামে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। ক্যাম্প থেকে আমিসহ আমাদের তালা এলাকার আটজন অস্ত্র, গ্রেনেড ও প্রয়োজনীয় গুলি নিয়ে ঝাউডাঙ্গা, দেবনগর, খেজুরডাঙ্গা দিয়ে হরিনখোলা গ্রামে আসি। সেখানে এসে দেখা হয় মুজিব বাহিনীর সাথে। তাদের সহযোগিতায় তালার মাদরায় ক্যাম্প করি। এবং এখান থেকে পর্যায়ক্রমে তালার গাছা, মাদরা ও মাগুরাসহ বিভিন্ন এলাকায় যুবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নিয়ে আসার কাজ করতে থাকি। তবে এই এলাকায় আমাদের বেশী মোকাবেলা করতে হয়েছে নকশাল বাহিনীর সাথে। তাদের জন্য আমরা খুবই বিব্রত ছিলাম।
আমরা ঝনু রায় চৌধুরী নামক একজনের বাসায় থাকতাম। এটা ছিলো মূলত একটা বাগান বেষ্টিত বাড়ি। ঝনু রায় চৌধুরী আমাদের অনেক সহযোগিতা করতেন। একদিন ঝনু রায় চৌধুরী আমাদের এক সহযোদ্ধাকে নিয়ে ভারতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু পথিমধ্যে রাজাকাররা তাকে আটক করে। এসময় আমাদের সহযোদ্ধা পালিয়ে আসতে পারলেও রাজাকাররা ঝনু রায় চৌধুরীকে ব্রেনেট দিয়ে খুচিয়ে খুচিয়ে হত্যা করে। এটা আমাদের খুবই কষ্ট দিয়েছিলো।
বীর মুক্তিযোদ্ধা সুভাষ সরকার তার যুদ্ধকালীন বেদনার কথা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, আমরা নৌ-কমান্ডার রহমতউল্লাহ, মুজিব বাহিনীর ইঞ্জিনিয়র মুজিবুর, স ম আলাউদ্দীন, আব্দুস সালাম, ক্যাপ্টেন শফিউল্লাহ’র নেতেৃত্বে কপিলমুনি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছি। ক্যাম্পে প্রায় দেড়-দুশ মুক্তিযোদ্ধা ছিলো। ২৫ নভেম্বর হঠাৎ রাজাকার ও মিলিশিয়া বাহিনী আক্রমণ করে। তারা প্রথমে মাগুরা বাজারে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে গুলি করতে করতে আমাদের ক্যাম্পের দিকে এগোতে থাকে। এসময় ক্যাম্পের পেছনের ধান ক্ষেত দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র-গুলি দিয়ে বের করে দিতে সক্ষম হই। এসময় আমার নেতৃত্বে সাতজন মুক্তিযোদ্ধা রাজাকার ও মিলিশিয়া বাহিনীকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করি। তাদের সাথে আমাদের দীর্ঘক্ষণ যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে আমার তিন সহযোদ্ধা বরকত, আজিজ ও সুনিল শহীদ হয় এবং মন্টু বলে আরেকজন সহযোদ্ধার পেটে গুলি লেগে নাড়ি-ভুড়ি বেরিয়ে যায়। তাকে উদ্ধার করে ভারতে পাঠিয়ে দেই। কিন্তু অপর তিন জনকে নির্মম ভাবে গুলি করে এবং ব্রেনেট দিয়ে খুচিয়ে হত্যা করে রাজাকাররা। এসময় একজন শহীদ আমাকে বলে ‘দাদা বাড়িতে সংবাদ দেবেন আমি দেশের জন্য মারা যাচ্ছি’। কিন্তু আমি তাদের রক্ষা করতে পারিনি। এটা আমার ব্যর্থতা। আর ওই আকুতির কথাগুলো আজও আমার কানে বাজে।
কেমন বাংলাদেশ দেখতে চান এমন প্রশ্নের জবাবে মুক্তিযোদ্ধা সুভাষ সরকার বলেন, আজকের বাংলাদেশের চিত্র ভয়ংকর। আমরা যে বাংলাদেশ চেয়েছিলাম সেটা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। আমাদের চিন্তা-চেতনা উল্টেপাল্টে গেছে। আজ ৭১ এর চেতনার বিচ্যুতি ঘটেছে। সবাই ক্ষমতার লোভের পিছু ছুটছে। এখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মানুষরা জামায়ত বা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীদের সাথে মিছে যাচ্ছে। কেন জানি সবাই রক্তের সাথে বেঈমানী করছে। এটা যেন বাংলাদেশে বসে পাকিস্তানের কার্যক্রম চলছে। এটার জন্য যুদ্ধ করিনি। আমরা চাই এটা থেকে বেরিয়ে আসতে। আমরা যে সোনার বাংলা চেয়েছিলাম সেটা বাস্তবায়ন করতে। আর এটা করা সম্ভব যদি বর্তমান প্রজন্ম এগিয়ে আসে। সঠিক ইতিহাস জেনে তারা আমাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য যুদ্ধ করুক। তাহলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন হবে।

Leave a Reply