ঢাকাSaturday , 17 October 2026
  1. Mobile Phones
  2. Photography
  3. Video
  4. অনলাইন
  5. অপরাধ
  6. আন্তর্জাতিক
  7. আশাশুনি
  8. ইসলাম
  9. উন্নয়ন
  10. উপকূল
  11. এক্সক্লুসিভ
  12. এনজিও
  13. কয়রা
  14. কলাম
  15. কলারোয়া

জলবায়ু পরিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে পদ্ম, অস্তিত্ব সংকটে উপকূলের ধর্মীয় সংস্কৃতি

admin ঢাকা
আপডেট: 17 October 2026, 10:08

আবিদা রহমান:
* সাতক্ষীরা-খুলনা উপকূলে লবণাক্ততার আগ্রাসনে বিপন্ন মিঠাপানির জলাশয়

* পূজার পদ্ম সংগ্রহে ভোগান্তি, সীমান্ত পেরিয়েও আনতে হচ্ছে ফুল

‘আগে পূজার সময় পদ্মফুল সংগ্রহ করতে খুব বেশি দূরে যেতে হতো না। এলাকার বিল, পুকুর ও জলাশয়েই পাওয়া যেত। এখন সেসব জায়গায় পদ্মফুল দেখা যায় না। দূর থেকে ফুল কিনে আনতে হয়। অনেক সময় চাহিদামতো পাওয়াও যায় না। মায়ের পূজায় যে ফুলের এত গুরুত্ব, সেটির জন্য এভাবে হন্যে হয়ে ঘুরতে হবে, কখনো ভাবিনি।’
আক্ষেপের সুরে কথাগুলো বলছিলেন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ঐতিহাসিক যশোরেশ্বরী কালী মন্দিরের পূজারি দিলীপ চক্রবর্তী। তাঁর কথায় উঠে আসে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের এমন এক সংকটের চিত্র, যা কেবল প্রকৃতি কিংবা মানুষের জীবন-জীবিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা ধর্মীয় আচার, লোকজ ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক জীবনেও।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাতক্ষীরা ও খুলনার উপকূলীয় জনপদে লবণাক্ততার বিস্তার, ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস, মিঠাপানির জলাশয় সংকুচিত হওয়া এবং অপরিকল্পিত জলাভূমি ব্যবস্থাপনায় হুমকির মুখে পড়েছে পদ্মের প্রাকৃতিক আবাসস্থল। সাতক্ষীরার শ্যামনগরের বিভিন্ন এলাকার পূজারি, পূজা আয়োজক ও প্রবীণ বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় যেসব পুকুর, বিল ও জলাশয়ে বর্ষা এলেই পদ্ম ফুটত, সেসব জায়গার অনেকগুলোতেই এখন আর ফুলটির দেখা মেলে না।

এ সংকটের প্রত্যক্ষ চিত্র পাওয়া গেছে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে। তবে এর পেছনে থাকা লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও মিঠাপানির জলাশয় হারিয়ে যাওয়ার সমস্যা শুধু শ্যামনগরের নয়; খুলনার কয়রা, দাকোপ ও পাইকগাছাসহ দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের বিস্তীর্ণ জনপদেও একই ধরনের পরিবেশগত চাপ রয়েছে। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায়ও সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার কারণে মিঠাপানির প্রাপ্যতা ও মানুষের জীবিকায় বিরূপ প্রভাবের তথ্য উঠে এসেছে।

এই পরিবর্তন পদ্মের মতো মিঠাপানিনির্ভর জলজ উদ্ভিদের জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। তবে সাতক্ষীরা-খুলনা উপকূলজুড়ে ঠিক কত জলাশয় থেকে পদ্ম হারিয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক জরিপের তথ্য পাওয়া যায়নি।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে শারদীয় দুর্গাপূজা। দেশজুড়ে উৎসবের আমেজ থাকলেও সাতক্ষীরা উপকূলের একাধিক পূজামণ্ডপে আয়োজকদের চিন্তা পদ্মফুল সংগ্রহ নিয়ে।

দুর্গাপূজার বিভিন্ন আচারে পদ্মের বিশেষ ধর্মীয় তাৎপর্য রয়েছে। বিশেষত সন্ধিপূজায় ১০৮টি পদ্ম নিবেদনের প্রচলন থাকায় ফুলটির প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি।

যশোরেশ্বরী কালী মন্দিরের পূজারি দিলীপ চক্রবর্তী বলেন, ‘পদ্ম আমাদের কাছে শুধু একটি ফুল নয়। পূজার বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানে এর প্রয়োজন হয়। আগে স্থানীয়ভাবে পাওয়া যেত বলে বিষয়টি নিয়ে কখনো চিন্তা করতে হয়নি। এখন পদ্মের জন্য অন্য এলাকার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘একসময় বর্ষাকালে গ্রামের জলাশয়ে তাকালেই পদ্ম দেখা যেত। এখন অনেক জলাশয়ে পানি থাকলেও পদ্ম নেই। পরিবেশের এই পরিবর্তন আমাদের ধর্মীয় আচারেও প্রভাব ফেলছে।’

আইলার পর থেকে জলাশয়ে পদ্ম নেই, দাবি স্থানীয়দের

২০০৯ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আইলা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাত্রায় দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করে। ঘূর্ণিঝড়ের জলোচ্ছ্বাসে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে বহু মিঠাপানির পুকুর, বিল ও কৃষিজমিতে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, সেই দুর্যোগের পর থেকে তাঁদের এলাকার অনেক জলাশয়ে পদ্মের স্বাভাবিক বিস্তার আর ফিরে আসেনি।

শ্যামনগরের মানিকখালী সার্বজনীন পূজামণ্ডপের আয়োজক কমিটির সদস্য প্রসেনজিৎ কুমার মণ্ডল বলেন, ‘গত বছর আমাদের পূজায় ব্যবহারের জন্য ভারত থেকে পদ্মফুল সংগ্রহ করতে হয়েছিল। এ বছরও পদ্মফুলের জন্য দেশের বিভিন্ন এলাকায় খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে বা দেশের অন্য কোথাও পর্যাপ্ত পদ্মফুল পাওয়া না গেলে এবারও ভারত থেকে পদ্মফুল এনে পূজার আয়োজন করার প্রস্তুতি রয়েছে।’

তাঁর ভাষায়, কয়েক বছর আগেও এলাকায় সহজেই পদ্মফুল পাওয়া যেত। এখন সেই পরিস্থিতি আর নেই। ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর থেকেই তাঁদের এলাকার জলাশয়ে পদ্মের উপস্থিতি কমে গেছে বলে দাবি করেন তিনি।

শুধু মানিকখালী নয়, শ্যামনগরের জেলেখালি, পৌর সদরের কাঁচড়াহাটি, নকিপুর হরিসভা মন্দির এবং নকিপুর ব্রাহ্মণপাড়া মন্দিরসহ বিভিন্ন পূজামণ্ডপের আয়োজকদের বক্তব্যেও উঠে এসেছে পদ্ম সংগ্রহের একই সংকট।

কোনো কোনো মণ্ডপকে ফুল সংগ্রহ করতে হচ্ছে দূরের জেলা থেকে। প্রয়োজনের সময় পর্যাপ্ত ফুল না পাওয়ায় বাড়ছে উদ্বেগ। স্থানীয়ভাবে ফুলের সহজলভ্যতা কমে যাওয়ায় ধর্মীয় আয়োজনের ব্যয়ও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন আয়োজকেরা।

বাংলাদেশ হিন্দু পরিষদের শ্যামনগর উপজেলা সদস্যসচিব উৎপল মণ্ডল বলেন, আগে পূজার প্রয়োজনীয় অনেক ফুল স্থানীয় জলাশয় ও আশপাশের পরিবেশ থেকেই সংগ্রহ করা সম্ভব হতো। এখন অধিকাংশ ফুল বাজার থেকে কিনতে হচ্ছে। পদ্মের সংকট তুলনামূলক বেশি।

তিনি বলেন, ‘স্থানীয়ভাবে না পাওয়ায় দূর থেকে সংগ্রহ করতে হয়। এতে খরচও বাড়ে, আবার সব সময় প্রয়োজনীয় ফুল পাওয়া যায় না।’
পদ্ম সংরক্ষণে ধর্মীয় সংগঠন, স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

সাতক্ষীরা-খুলনার উপকূলজুড়ে মিঠাপানির জলাশয় সংকটে

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল। সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি থেকে খুলনার কয়রা, দাকোপ ও পাইকগাছা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততার বিস্তার এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহের পরিবর্তন দীর্ঘদিনের সমস্যা।

এসব জনপদে কৃষি, মাছ চাষ, সুপেয় পানি ও গবাদিপশু পালনের ওপর পরিবেশগত পরিবর্তনের প্রভাব বহুল আলোচিত। কিন্তু একই পরিবর্তনে প্রাকৃতিক জলাশয়ের উদ্ভিদবৈচিত্র্য এবং ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সে আলোচনা তুলনামূলক কম।

উপকূলের অনেক এলাকায় মিঠাপানির জলাশয় লোনা পানির প্রভাবে বদলে যাচ্ছে। আবার কোথাও জলাশয় ভরাট, দখল, মাছের ঘের সম্প্রসারণ ও অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবস্থাপনার কারণে দেশীয় জলজ উদ্ভিদের স্বাভাবিক আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে।

পদ্ম মূলত মিঠাপানির জলজ উদ্ভিদ। অনুকূল জলাশয়, কাদামাটি এবং পানির উপযুক্ত পরিবেশে এর বিস্তার ঘটে। কিন্তু পানির লবণাক্ততা, গুণগত পরিবর্তন এবং জলাশয়ের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট হলে এর বৃদ্ধি ও প্রজনন ব্যাহত হতে পারে।

শ্যামনগরের কাঁচড়াহাটি এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা নিতাই মণ্ডল বলেন, ‘ছোটবেলায় বর্ষা এলেই গ্রামের অনেক পুকুর ও বিলে পদ্ম ফুটতে দেখেছি। পূজার সময় বাড়ির লোকজন নিজেরাই পদ্ম তুলে আনত। এখন সেই দৃশ্য আর দেখা যায় না। আগের মতো মিষ্টি পানির অনেক জলাশয় নেই। এজন্য পদ্মফুলও আর নেই।’
তাঁর এই স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়েই বোঝা যায়, উপকূলের পরিবেশগত পরিবর্তন শুধু বর্তমান প্রজন্মের সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; হারিয়ে যাচ্ছে অতীতের চেনা প্রাকৃতিক দৃশ্যও।

জলবায়ুর পাশাপাশি দায়ী জলাশয় দখল ও অপরিকল্পিত মাছ চাষ

পদ্মের সংকটের জন্য শুধু জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করতে চান না বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি মানুষের নানা কর্মকাণ্ডও উপকূলের মিঠাপানির জলাশয় ও জলজ জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ তৈরি করছে।

শ্যামনগর সরকারি মহসিন ডিগ্রি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. প্রতাপ কুমার রায় বলেন, ‘উপকূলীয় এলাকায় জলাশয়ের প্রকৃতি ও পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে জলজ উদ্ভিদের বিস্তারেরও সম্পর্ক রয়েছে। লবণাক্ততা বৃদ্ধি, জলাশয় ভরাট ও দখল, পানির স্বাভাবিক প্রবাহের পরিবর্তন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পদ্মের মতো জলজ উদ্ভিদের উপযোগী আবাসস্থল কমে যেতে পারে।’

তিনি বলেন, অপরিকল্পিতভাবে লোনা পানিতে মাছ চাষ, কৃষিজমিতে অতিমাত্রায় কীটনাশকের ব্যবহার এবং মিঠাপানির জলাশয় দখলের কারণেও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। জলাশয়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ বদলে গেলে পদ্মসহ দেশীয় জলজ উদ্ভিদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়া অস্বাভাবিক নয়।

ড. প্রতাপ কুমার রায়ের মতে, শুধু ধর্মীয় প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে নয়, দেশীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষার স্বার্থেও পদ্মের আবাসস্থল সংরক্ষণ করা জরুরি। এ জন্য প্রাকৃতিক জলাশয় রক্ষা, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা এবং ক্ষতিগ্রস্ত জলাশয় পুনরুদ্ধারে উদ্যোগ প্রয়োজন।

‘পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো বইয়ের পাতায় পদ্ম দেখবে’

পদ্ম হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে উপকূলের মানুষের ধর্মীয় স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হারানোর আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
শ্যামনগরের পূজারি খগেণ চক্রবর্তী বলেন, ‘একটি ধর্মীয় আচার পালনের জন্য প্রয়োজনীয় ফুল যদি নিজের এলাকার প্রকৃতি থেকে আর পাওয়া না যায়, তাহলে বিষয়টি ভাবনার। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো বই বা ছবি দেখে জানবে যে এ এলাকায় একসময় প্রচুর পদ্ম ফুটত।’

তাঁর আশঙ্কা, পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে একসময় স্থানীয় পূজামণ্ডপগুলোতে পদ্মের পরিবর্তে বিকল্প ফুল ব্যবহারের প্রবণতা বাড়তে পারে। এতে ধর্মীয় আচার পালনের ঐতিহ্যগত ধারাবাহিকতায় পরিবর্তন আসার আশঙ্কাও রয়েছে।

খগেণ চক্রবর্তী বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু ঘরবাড়ি, কৃষিজমি বা মানুষের জীবিকায় সীমাবদ্ধ নেই। আমাদের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় জীবনেও এর প্রভাব পড়ছে।’
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাসে পদ্ম পবিত্রতা, সৌন্দর্য ও আধ্যাত্মিকতার প্রতীক। দেবদেবীর পূজা, অর্চনা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় আচারে পদ্মের ব্যবহার দীর্ঘদিনের। ফলে একটি অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে পদ্মের হারিয়ে যাওয়া শুধু একটি উদ্ভিদ কমে যাওয়া নয়, বরং প্রকৃতি ও মানুষের ধর্মীয় জীবনের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যাওয়ারও ইঙ্গিত।

অর্থনৈতিক ক্ষতির বাইরে হারিয়ে যাচ্ছে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আলোচনায় সাধারণত ঘূর্ণিঝড়ে ঘরবাড়ি ধ্বংস, কৃষিজমির ক্ষতি, খাদ্যনিরাপত্তা, সুপেয় পানির সংকট ও বাস্তুচ্যুতির বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। অথচ পরিবেশগত পরিবর্তনে ধর্মীয় আচার, লোকায়ত জ্ঞান, বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের যে ক্ষতি হয়, তা সহজে অর্থের হিসাবে প্রকাশ করা যায় না।

বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এ ধরনের ক্ষয়ক্ষতি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ‘অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি’ বা নন-ইকোনমিক লস অ্যান্ড ড্যামেজ-এর অন্তর্ভুক্ত।

লেখক, গবেষক ও পরিবেশকর্মী পীযূষ বাউলিয়া পিন্টু মনে করেন, পদ্ম হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টিকে শুধু একটি ফুলের সংকট হিসেবে দেখলে এর গভীরতা বোঝা যাবে না।
তাঁর মতে, উপকূলে মিঠাপানির জলাশয়ের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ বাড়ছে। এর সঙ্গে লবণাক্ত পানি প্রবেশ, জলাশয় ভরাট, মাছের ঘের সম্প্রসারণ এবং জলাভূমির ব্যবহার পরিবর্তনের মতো মানবসৃষ্ট সংকট যুক্ত হয়ে দেশীয় জলজ উদ্ভিদের টিকে থাকার পরিবেশকে আরও প্রতিকূল করে তুলছে।

তিনি বলেন, দুর্যোগে শুধু ঘরবাড়ি, অবকাঠামো বা অর্থনৈতিক সম্পদ নষ্ট হয় না; হারিয়ে যেতে পারে লোকায়ত জ্ঞান, গান, রীতি, কৃত্য, বিশ্বাস, প্রথা এবং বিরল প্রাণসম্পদও।
তাঁর প্রশ্ন, ‘মানুষ কি এমন জ্ঞানসম্পদ ছাড়া বাঁচতে পারে?’

পীযূষ বাউলিয়া পিন্টুর মতে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতির আন্তর্জাতিক আলোচনায় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ক্ষতিকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে উপকূলের হারিয়ে যেতে বসা প্রাকৃতিক সম্পদের স্থানীয় ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থার তথ্য সংরক্ষণ জরুরি।

জরুরি পদ্মের আবাসস্থল শনাক্ত ও পুনরুদ্ধার

সংশ্লিষ্টদের মতে, পদ্ম সংরক্ষণে প্রথমেই প্রয়োজন সাতক্ষীরা ও খুলনার উপকূলীয় এলাকায় যেসব জলাশয়ে একসময় পদ্ম জন্মাত, সেগুলোর বর্তমান অবস্থা শনাক্ত করা। কোথায় পদ্ম এখনো টিকে আছে, কোথায় কমেছে এবং কোন জলাশয় থেকে সম্পূর্ণ হারিয়েছে, তা নিরূপণে স্থানীয় পর্যায়ে জরিপ প্রয়োজন।

একই সঙ্গে পদ্মের বিস্তার কমে যাওয়ার সঙ্গে পানির লবণাক্ততা, জলবায়ু পরিবর্তন, জলাশয় দখল এবং অপরিকল্পিত মাছ চাষের সম্পর্ক নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

পীযূষ বাউলিয়া পিন্টু বলেন, মিঠাপানির জলাশয়কে লবণাক্ততার প্রভাব থেকে রক্ষা, প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ বজায় রাখা, জলাশয় ভরাট বন্ধ এবং দেশীয় জলজ উদ্ভিদের আবাসস্থল পুনরুদ্ধারে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, গবেষক এবং ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনগুলো সম্মিলিতভাবে কাজ করলে উপকূলের অবশিষ্ট পদ্মসমৃদ্ধ জলাশয়গুলো সংরক্ষণের সুযোগ রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে শুধু পূজার প্রয়োজন মেটাতে পদ্মের চাষ বাড়ানো নয়, বরং প্রাকৃতিক জলাভূমিতে পদ্মসহ অন্যান্য দেশীয় জলজ উদ্ভিদের টিকে থাকার পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।

পদ্ম হারানোর সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে উপকূলের পরিচিত প্রকৃতি

পদ্ম কন্দজাতীয় জলজ উদ্ভিদ। পুকুর, বিল, হ্রদ ও জলাভূমির কাদাময় মাটিতে এর শিকড় ও কন্দ বিস্তৃত হয়। পানির ওপরে বড় গোলাকার পাতা এবং সাদা বা গোলাপি রঙের ফুল ফোটে। সাধারণত বর্ষা থেকে শরৎকাল পর্যন্ত পদ্মের উপস্থিতি বেশি দেখা যায়।

একসময় দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের বিভিন্ন গ্রামের পুকুর ও বিলে পদ্মফুল ছিল বর্ষা ও শরতের চেনা দৃশ্য। সেই ফুলের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ধর্মীয় আচার, গ্রামীণ স্মৃতি ও ঋতুভিত্তিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।

কিন্তু লবণাক্ততার আগ্রাসন এবং মিঠাপানির আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে সেই চিত্র। উপকূলের মানুষ একদিকে জীবিকা, সুপেয় পানি ও কৃষিজমি রক্ষার সংগ্রাম করছেন, অন্যদিকে নিজেদের অজান্তেই হারিয়ে ফেলছেন প্রকৃতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বহু অনুষঙ্গ।

সাতক্ষীরা ও খুলনার উপকূলে পদ্মের সংকট তাই কেবল একটি ফুলের প্রাপ্যতার প্রশ্ন নয়। এটি জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত জলাভূমি ব্যবস্থাপনা এবং প্রাকৃতিক সম্পদ হারানোর সঙ্গে স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

শ্যামনগরের পূজারি দিলীপ চক্রবর্তীর আক্ষেপে সেই সংকটেরই প্রতিফলন, যে ফুল একসময় নিজের এলাকার পুকুর থেকে তুলে দেবীর চরণে নিবেদন করা যেত, আজ সেটি সংগ্রহ করতে অন্য জেলা, কখনো দেশের সীমানার ওপারেও খুঁজতে হচ্ছে।

প্রশ্ন এখন শুধু পদ্মফুল পাওয়া যাবে কি না, তা নয়; জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের প্রকৃতিনির্ভর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আগামী প্রজন্মের জন্য কতটা রক্ষা করা সম্ভব হবে, সেটিই বড় উদ্বেগ।

Share this news as a Photo Card

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

‎তালায় মাছ চুরির অভিযোগে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা ‎

16 October 2026
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
dailysuprovatsatkhira
www.suprovatsatkhira.com