ঢাকাFriday , 6 March 2026
  • অন্যান্য
  1. Mobile Phones
  2. Photography
  3. Video
  4. অনলাইন
  5. অপরাধ
  6. আন্তর্জাতিক
  7. আশাশুনি
  8. ইসলাম
  9. উন্নয়ন
  10. উপকূল
  11. এক্সক্লুসিভ
  12. এনজিও
  13. কয়রা
  14. কলাম
  15. কলারোয়া
আজকের সর্বশেষ সবখবর

লবণাক্ততার চাপে উপকূলের নারীর প্রজননস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে

admin
March 6, 2026 2:07 am
Link Copied!

আবিদা রহমান: 
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে সুন্দরবনসংলগ্ন খুলনার কয়রা উপজেলার মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। বছরের বিভিন্ন সময়ে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙনে বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। সঙ্গে বাড়ছে লবণাক্ততা ও সুপেয় পানির সংকট। এসব সংকটের বোঝা সবচেয়ে বেশি বহন করছেন নারী ও কিশোরীরা। স্বাস্থ্যকর্মীদের মতে, চর্মরোগ, অপুষ্টি ও মাসিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনার সমস্যার পাশাপাশি প্রজননস্বাস্থ্য নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

উপকূলের নারীদের ক্ষেত্রে জলবায়ু ঝুঁকি শুধু দুর্যোগের দিনেই সীমাবদ্ধ নয়। ঘরে খাবার ও পানি জোগাড়, শিশু ও বৃদ্ধদের দেখভাল এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনের বড় দায়িত্বও তাঁদের ওপর পড়ে। কিন্তু নিজের স্বাস্থ্যসেবা অনেক সময়ই পিছিয়ে যায়। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টে জেন্ডার সমতা, সুস্বাস্থ্য এবং নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলেও কয়রার প্রত্যন্ত এলাকায় এসব সেবা এখনো পর্যাপ্ত নয়।

কয়রার ৩৭ বছর বয়সী রহিমা বেগম দুই সন্তানের মা। মাসিকের সময় স্যানিটারি প্যাড ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, এ বিষয়ে তাঁর ধারণা খুবই সীমিত। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কোস্টাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (সিডিও) মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণেও দেখা গেছে, অনেক নারী এখনো মাসিকের সময় কাপড় ব্যবহার করেন। কিশোরীদের মধ্যে প্যাডের ব্যবহার কিছুটা বাড়লেও প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের মধ্যে সেই হার তুলনামূলক কম।

কিশোরী সোনালী আক্তার জানান, দোকানে গিয়ে স্যানিটারি প্যাড কিনতে তাঁর লজ্জা লাগে। তাই মায়ের কাছ থেকে কাপড় নিয়ে ব্যবহার করেন। ব্যবহৃত কাপড় অনেক সময় ঘরের আড়ালে শুকাতে হয়। পর্যাপ্ত রোদ ও বাতাস না পেলে ভেজা বা অপরিষ্কার কাপড় পুনর্ব্যবহারে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। দুর্যোগের সময় নিরাপদ পানি ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অভাবে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়।

কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের বতুল বাজার কমিউনিটি ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) উম্মেহানী আক্তার বলেন, উপকূলীয় নারীদের মধ্যে পুষ্টিহীনতা, অনিয়মিত ঋতুস্রাব ও প্রজননস্বাস্থ্যের নানা জটিলতা নিয়ে রোগীরা আসেন। তাঁর ভাষ্য, “কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বাড়ানো এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ বাড়ানো গেলে নারী ও কিশোরীদের অনেক সমস্যা কমিয়ে আনা সম্ভব।”

কয়রার নারীদের মাসিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ২০২৩ সালে কয়রা উপজেলার ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ১০১ নারীর ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের ৭২ দশমিক ৩ শতাংশ মাসিকের সময় কাপড় ব্যবহার করে তা লবণাক্ত পানিতে ধুয়ে আবার ব্যবহার করতেন। স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করতেন ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ। গবেষকেরা সুপেয় পানির স্বল্পতা ও লবণাক্ততার কারণে নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার বিষয়টি তুলে ধরেছেন।

সিডিও কয়রার পাঁচ শতাধিক নারী ও কিশোরীর মধ্যে পুনর্ব্যবহারযোগ্য স্যানিটারি প্যাড বিতরণ ও ব্যবহারবিষয়ক সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। সংগঠনটির পর্যবেক্ষণ, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, প্যাডের দাম, সামাজিক সংকোচ এবং সঠিক তথ্যের অভাবে অনেক নারী নিরাপদ মাসিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনা থেকে পিছিয়ে আছেন। স্থানীয় পরিবার পরিকল্পনা কর্মীদেরও ভাষ্য, কিশোরীদের মধ্যে প্যাডের ব্যবহার বাড়লেও বয়স্ক নারীদের বড় একটি অংশ এখনো কাপড়ের ওপর নির্ভরশীল।

কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সুদিপ বালা বলেন, লবণাক্ত পানির সংস্পর্শে থাকার কারণে উপকূলের মানুষের মধ্যে চর্মরোগ ও ছত্রাকজনিত রোগ বেশি দেখা যায়। নারীদের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন স্বাস্থ্যসমস্যা নিয়ে রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসেন। তিনি বলেন, “আমরা সাধ্য অনুযায়ী সেবা দিয়ে যাচ্ছি। তবে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংকটের পাশাপাশি নারীদের সচেতনতার ঘাটতিও কিছু ক্ষেত্রে জটিলতা বাড়াচ্ছে।

২৭ বছর বয়সী নিপা খাতুনের একাধিকবার গর্ভপাত হয়েছে। তাঁর পরিবারে আর্থিক সংকট রয়েছে, প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার নিয়মিত জোটে না। তিনি প্রজননতন্ত্রের সংক্রমণসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। তবে তাঁর এসব স্বাস্থ্যসমস্যাকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তন বা লবণাক্ততার ফল বলা যায় না। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন, গর্ভপাত বা প্রজননস্বাস্থ্য সমস্যার পেছনে পুষ্টি, বয়স, রোগ, চিকিৎসাসেবায় প্রবেশাধিকারসহ একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। নিপার অভিজ্ঞতা বরং দেখায়, জলবায়ু ঝুঁকি কীভাবে আগে থেকেই থাকা দারিদ্র্য ও স্বাস্থ্যসেবা ঘাটতিকে আরও তীব্র করে তোলে।

লবণাক্ততার সঙ্গে মাতৃস্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়েও গবেষণা হয়েছে।

চলতি বছরের আগস্টে প্রকাশিত BMC Women’s Health এর একটি গবেষণাতেও উপকূলীয় বাংলাদেশের প্রজনন বয়সী নারীদের উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রে পানীয় জলের লবণাক্ততাকে একটি কাঠামোগত ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

খুলনার দাকোপে ২০২ গর্ভবতী নারীসহ মোট ১ হাজার ২০৮ নারীর ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় পানীয় জলে উচ্চমাত্রার সোডিয়ামের সঙ্গে প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া ও গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বৃদ্ধির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। গবেষকেরা উপকূলীয় এলাকায় কম লবণযুক্ত নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

পাশের জেলা সাতক্ষীরার শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়নে ২০২৫ সালে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় ১৮ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের ২৩৪টি পরিবারের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে নিরাপদ পানির উৎসের দূরত্ব, নিকটতম স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দূরত্ব এবং পানিনির্ভর পেশার সঙ্গে প্রজননস্বাস্থ্য সমস্যার উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া যায়। তবে গবেষণাটি ক্রস-সেকশনাল হওয়ায় লবণাক্ততাকে এসব সমস্যার একমাত্র কারণ হিসেবে দেখানো হয়নি।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল প্রায় চার কোটি মানুষের আবাস। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, উপকূল ক্ষয়, লবণাক্ততা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকাকে প্রভাবিত করছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় বাঁধ, আশ্রয়কেন্দ্র ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হলেও জনস্বাস্থ্য ও নারীর বিশেষ প্রয়োজনকে জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনায় আরও গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ রয়েছে।

কয়রার বাস্তবতায় তাই শুধু দুর্যোগের পর ত্রাণ নয়, দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রত্যন্ত এলাকায় নিরাপদ পানির স্থায়ী উৎস, কমিউনিটি ক্লিনিকে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী, নিয়মিত প্রজননস্বাস্থ্য পরীক্ষা, সাশ্রয়ী মাসিক স্বাস্থ্যপণ্য এবং স্কুল-কলেজে কিশোরীদের জন্য স্বাস্থ্যশিক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।

উপকূলের জলবায়ু সংকটের ক্ষতি শুধু ভাঙা বাঁধ, ডুবে যাওয়া জমি কিংবা নষ্ট ফসলের হিসাবে সীমাবদ্ধ নয়। এর একটি নীরব মূল্য জমা হচ্ছে নারীর শরীরেও। সেই স্বাস্থ্যঝুঁকিকে জলবায়ু অভিযোজনের মূল পরিকল্পনায় জায়গা না দিলে টেকসই উন্নয়ন ও জেন্ডার সমতার লক্ষ্য অর্জন আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।