সদর হাসপাতালে বেড়েছে ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের দৌরাত্ম্য : বিপাকে পড়ছে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা
নিজস্ব প্রতিনিধি : সাতক্ষীরায় কর্মরত বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের (রিপ্রেজেন্টেটিভ) দখলে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল। চিকিৎসকের রুম থেকে বের হতে না হতেই রোগীর প্রেসক্রিপশন নিয়ে টানাটানি আর ছবি তোলা শুরু করেন তারা। কোনরকম অনুমতি না নিয়েই হাত থেকে কেড়ে নেন রোগীর ব্যবস্থাপত্র। দীর্ঘদিন যাবৎ এমন চিত্র সাধারণ মানুষের চোখে পড়লেও চোখে পড়ে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। শুধুমাত্র প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার দুপুর ১টার পর হতে ডাক্তার ভিজিট করতে পারবেন আর বাকি দিন ডাক্তার ভিজিট করতে পারবেন না ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা। এছাড়া হাসপাতালের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে কোন রোগীর প্রেসক্রিপশন নিয়ে ছবি উঠাতে পারবেন না এমন নীতিমালা থাকলেও এ বিষয়টিকে কোনভাবে কর্ণপাত করছেন না তারা। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা একাধিক রোগীরা জানায়, ‘আমরা যে দিনই হাসপাতালে এসেছি সে দিনই কোন না কোন ঔষধ কোম্পানির লোকজন এস প্রেসক্রিপশনের ছবি তুলে নেন। এতে আমরা বিব্রতবোধ করি’। সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে এক রোগীর স্বজন মহসিন আলী জানান, ‘সরকারি এই হাসপাতালের বর্হি-বিভাগে ডাক্তার দেখাতে প্রতিদিন ছুটে আসেন হাজার হাজার রোগী। কিন্তু রোগী দেখার সময় ওই ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা ডাক্তারদের রুমে ঢুকে তাদের কোম্পানির ঔষধ সম্পর্কে লেকচার দিয়ে সময় নষ্ট করেন। আর এদিকে অসহায় রোগী ও তাদের স্বজনরা বাইরে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকেন সিরিয়ালের জন্য। তারপর সিরিয়াল পেয়ে যখন রোগীরা ডাক্তার দেখিয়ে ব্যবস্থাপত্র নিয়ে বাইরে বের হন তখনই কোনরকম অনুমতি না নিয়ে রোগী ও তাদের স্বজনদের হাত থেকে কেড়ে নেন ব্যবস্থাপত্র। তারপর একাধিক ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা শুরু করেন পালাক্রমে ছবি তোলা। সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে ঢুকলে মনে হয় চিকিৎসা নিতে রোগী এবং রোগীর স্বজনরা জিম্মি হয়ে পড়েছেন ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের কাছে’। সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যাওয়ার সময় হালিমা খাতুন নামে এক রোগী জানায়, ‘ আমি চিকিৎসা নিতে আসলাম সিরিয়ালের জন্য ঢুকতে পারিনি। ভিতরে দেখলাম সু পরে ইন করা কয়েকজন বসে ডাক্তারের সাথে গল্প করছে। দুপুর হওয়ার সাথে সাথেই আবার ডাক্তার চলে যাবে। ডাক্তারদের হাসপাতালে ভালো করে রোগী দেখার সময় থাকে না ক্লিনিকে যাওয়ার জন্য’। শহরের চালতেতলা এলাকার রবিউল ইসলাম নামের এক রোগী বলেন, ‘চিকিৎসা নিতে এসে ঔষধ কোম্পানির লোকসহ অনেক দালালের হাতে পড়তে হচ্ছে। তারা পঙ্কপালের মতো এসে আমাকে ঘিরে ধরে প্রেসক্রিপশন কেড়ে নিয়ে ছবি তুলতে শুরু করে। ছবি তোলার কারণ জানতে চাইলে তারা বলেন ‘এটা আমাদের ডিউটি। ছবি না তুললে আমাদের চাকরি থাকবে না।’ শুধু হালিমা খাতুন বা রবিউল ইসলাম নয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অধিকাংশ রোগীদের সাথে এ রকম ব্যবহার করা হচ্ছে। যেটা রোগীদের জন্য খুবই বিরক্তিকর এবং মানসিক ভোগান্তিও’। একাধিক সূত্র জানায়, প্রতিদিন ইনসেপ্টা, অ্যারিষ্টোফার্মা, হেলথ কেয়ার, অপসোনিন, বেক্সিমকো, স্কয়ার, রেনেটা, এসকেএফ, একমি’র মতো শতাধিক ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা সকাল থেকে ভিড় করে প্রতিটি বিভাগের ডাক্তারদের রুমের সামনে আর হাসপাতালের গেটে। পদোন্নতি ও চাকুরি বাঁচানোর জন্য দিনের পর দিন তারা এহেন কর্মকান্ড করেই চলেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধি জানায়, ‘পদোন্নতি ও ঔষধ কোম্পানির টার্গেট পূরণ করতেই রোগীর কাছ থেকে ব্যবস্থাপত্র নিয়ে নিশ্চিত হতে হয় ডাক্তার কোন কোম্পানির ঔষধ লিখেছে। নিজেদের পদোন্নতি ও চাকুরি টিকিয়ে রাখতে আমরা ব্যবস্থাপত্রের ছবি তুলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করি’। তারা আরও বলেন, ‘তাদের কোম্পানির ঔষধ লেখার কারণে ডাক্তারদের প্রতিমাসে কোম্পানি থেকে উপঢৌকন দেওয়া হয়। যে ডাক্তার যত বেশি ঔষধ লেখেন, তাদেরকে তত বেশি উপঢৌকন দেওয়া হয়। হাসপাতাল সূত্র জানায়, ‘সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে ঔষধ কোম্পানির লোকজন যেন কোন রোগীর কাছ থেকে প্রেসক্রিপশন নিয়ে ছবি তুলতে না পারে সে ব্যাপারে দায়িত্ব পালন করছেন হাসপাতালের কর্মচারী হারুন-অর-রশিদ। তবে তিনি তাদেরকে কোনভাবে নিষেধ না করে তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন সুবিধা নিয়ে হাসপাতালের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার সুযোগ করে দেন বলে অভিযোগ আছে। সরেজমিনে দেখা গেছে হারুণ অর রশিদ হাসপাতালের অভ্যন্তরে যেয়ে ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের সাথে খোশগল্পে মেতে উঠেছেন। তবে হাসপাতালের কর্মচারী হারুণ অর রশিদ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘ওটা আমার একার দায়িত্ব না। ডাক্তাররা যদি ঢোকার সুযোগ না দেন তবে তারা ঢোকার সাহস পায় না। আপনারা ছবি তুলে নিউজ করেন’। এ বিষয়ে সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন ডা. হোসাইন সাফায়েত হোসেন বলেন, ‘কোন ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের হাসপাতালের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে ছবি তোলার সুযোগ নেই। তাছাড়া তারা সপ্তাহে দুই দিন ব্যতীত ডাক্তার ভিজিট করতে পারবেন না। আমরা বারবার এ ব্যাপারে তাদেরকে সতর্ক করেছি। এরপরও যদি তারা না শোনে তবে অবশ্যই তাদের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে’।

Leave a Reply