গাজী আল ইমরান, শ্যামনগর প্রতিনিধি: শ্যামনগর উপজেলার সোথা ও সংক্রান্তি খালে লবণ পানি তুলে অপরিকল্পিত নেট পাটা দেওয়ায় জনজীবন বিপন্নতার মুখে পড়েছে। কাশিমাড়ি ইউনিয়নের খুঁটিকাটা, কাচিহারানিয়া ও কাঁঠালবাড়ীয়া প্রায় ৪শ’ পরিবারের জীবন জীবিকা সোতা খালের উপর নির্ভরশীল। খালটির দৈর্ঘ্য ২ কিলোমিটার, প্রস্থ ৬০-৬৫ ফুট যা খুঁটিকাটা মৌজার ১ নং খতিয়ানে ৭৭৫ ও ৮২৭ দাগে অবস্থিত। সরকারী উদ্যোগে ২০০৯ সালে খালটি পূন:খনন করা হয়। খালটিতে বর্ষার পানি থাকায় গ্রামের কৃষকেরা এই খালের মিষ্টি পানি কৃষি কাজে ব্যবহার করত। স্থানীয়রা খাল থেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহসহ এ খালের উপর নির্ভর করে গবাদিপশু-পাখি পালন করত। কৃষকেরা খালের পানি সেচ দিয়ে আমন ও বোরো মৌসুমে ফসল উৎপাদন করত। তিন গ্রামের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তায় ও জলবায়ু অভিযোজনে সোতা খাল পূন:খনন ছিল সরকারের গরুত্বপূর্ন উদ্যোগ। কিন্তু, ২০১৩ সাল থেকে কতিপয় কয়েকজন ব্যক্তি খাল ইজারা নিয়ে লবণ পানি তুলে দেয়। মিষ্টি পানির খালে লবণ পানি উঠানোর ফলে সোতা খাল নির্ভর ৩ গ্রামের কৃষি নির্ভর জীবনযাত্রা বিপন্ন হয়ে পড়ে। একই সাথে সোতা খালের সাথে সম্পৃক্ত গ্রামের আরেকটি খাল সংক্রান্তির প্রাণ প্রবাহ করতে সরকার একই বছরে পূন:খনন করে। খালটির দৈর্ঘ্য ২ কিলোমিটার, প্রস্ত ৬০-৬৫ ফুট যা কাঁঠালবাড়ীয়া মৌজার ১ নং খতিয়ানে ৫২৯ দাগ ও খুঁটিকাটা মৌজার ৮৭ ও ১৩৫ দাগে অবস্থিত। কিন্তু একই সালের সংক্রান্তি খালের ১৩৫ দাগের ইজারা নিয়ে সমস্ত খালটি ভোগ করছে কয়েকজন ইজারাদাররা। সোথা ও সংক্রান্তি খালের লবণ পানি তুলে মাছ চাষ করছে ইজারাদাররা। সাথে খালের বিভিন্ন স্থানে নেট পাটাও দিয়েছে তারা। গ্রামের কৃষকদের খালের পানি ব্যবহার করতে দেয় না, এমনকি খালের রাস্তায় হাটতেও বাঁধা দেয়! সরজমিনে গ্রামের কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায় যে, খালে লবণ পানি উঠানোর ফলে গ্রামের সুপেয় পানি পুকুর, ডোবা, খানা, বসতভিটার কৃষি জমি লবণাক্ত হয়ে পড়েছে। বোরো মৌসুমে কৃষি কাজ বন্দ হয়ে যায়। স্থানীয়রা দীর্ঘদিন যাবৎ খালের উপর নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় চেষ্টা করতে থাকে। বিগত সময়ে স্থানীয়রা কৃষি কাজের জন্য খাল উন্মুক্তসহ খালের মিষ্টি পানি ব্যবহার ও পাটা অপসারণে মানবন্ধন, স্মারকলিপি ও আবেদন পত্র কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছিল। পরবর্তীতে বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন থেকে সরেজমিনে তদন্তের পরে সোতা খালের লবণ পানি সেচে মাছ ধরে নিয়েছিল ইজারাদাররা। পরবর্তীতে শুধু মাত্র ২০১৫ সালে খালটি উন্মুক্ত থাকে এবং বর্ষা মৌসুমে ও রবি মৌসুমে স্থানীয় কৃষকেরা ফসল ফলাতে সক্ষম হন। ২০১৫ সালে মিষ্টি পানি সংরক্ষণ থাকায় কৃষকেরা আমন পরবর্তী সময়ে বোরো ধান চাষের পরিকল্পনা করতে থাকে। তখনই কিছু অসাধু ব্যক্তি আবারও বাঁধ কেটে খালে লবণ পানি উত্তোলনের পাঁয়তারা করতে থাকে এবং এক পর্যায়ে গভীর রাতে একদল অসাধু ব্যক্তি বাধ কেটে আবারও লবণ পানি তুলে দেয়। লবণ পানি প্রবেশে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জনজীবনে আবার দুর্ভোগ নেমে আসে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় আবারও ২০১৬ সালে উপজেলা প্রশাসন বরাবর একটি আবেদন করি। সে ক্ষেত্রে উপজেলা প্রশাসন থেকে সরেজমিনে তদন্তে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং ইজারাদারদের সাথে আলোচনা করেন ও পরবর্তীতে আর লবণ পানি যেন না উঠায় তার প্রতিশ্রæতি দিয়েছিল। ইজারাদাররা সে সময় লবণ পানি না উঠানোর কথা জানালেও পরবর্তীতে সে কথা না মেনে আবারও লবণ পানি তোলেন। আর সেখান থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত খালে লবণ পানি উঠিয়ে এবং বিভিন্ন স্থানে নেট পাটা দিয়ে ইজারাদাররা মাছ চাষ করছে। খুঁটিকাটা গ্রামের সোতা ও সংক্রান্তি খাল পাড়ের বাসিন্দাদের নিশিকান্ত, শিবানিদের সাথে কথা হলে জানান, খালে যখন মিষ্টি এবং উন্মুক্ত ছিল তখন গ্রামে শান্তি ছিল। এখন খাল দখল করে লবণ পানির মাছ চাষ করায় আমাদের বসবাস কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। গ্রামে খাবার পানির কষ্ট, সবজি চাষের ভিটে নোনা হয়ে যাচ্ছে। খালটি ৫/৭ জন ভোগ-দখল করে শত শত পরিবারের ক্ষতি করছে, এলাকার গাছ পালা মরে যাচ্ছে। এলাকায় বৃক্ষশুন্য হয়ে পড়ছে। অতিদ্রæত খাল অবমুক্তসহ খালে মিষ্টি পানির ব্যবস্থা করে ৪/৫ গ্রামের মানুষের জীবন জীবিকা রক্ষায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে এলাকাবাসী। সম্মিলিত উদ্যোগে সুতা ও সংক্রান্তি খাল অবমুক্তসহ মিষ্টি পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারলে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় তা হবে একটি যুগন্তকারী পদক্ষেপ।
