সাংবাদিকদের সাথে প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বিচারপতি মমতাজ উদ্দিন: নিবন্ধনের আওতায় আসবে সাংবাদিকরা, সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন
dig ফাহাদ হোসেন: বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বিচারপতি মোহাম্মদ মমতাজ উদ্দিন বলেছেন, রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ গণমাধ্যম। তাই রাষ্ট্রের ভিত্তি মজবুত রাখতে সাংবাদিকতাকে এগিয়ে নেওয়ার বিকল্প নেই। একদিকে আমাদেরকে যেমন হলুদ সাংবাদিকতা পরিহার করতে হবে, তেমনি সরকারকেও সাংবাদিকদের উপর চাপিয়ে দেয়া আইন বর্জন অথবা শিথিল করতে হবে। এজন্য ইতোমধ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
রোববার (২৮ এপ্রিল) সাতক্ষীরা সার্কিট হাউজের কনফারেন্স রুমে স্থানীয় সাংবাদিকদের সাথে আইন ও আচরণবিধি সম্পর্কিত মতবিনিময়কালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
বিচারপতি মোহাম্মদ মমতাজ উদ্দিন আরও বলেন, সাংবাদিকদের নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে। তাহলে নিবন্ধিত সাংবাদিকদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা ও ভুয়া সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্য রোধ করা সম্ভব হবে। অপসাংবাদিকতা পরিহার করে রীতিনীতির মধ্যে আসতে হবে। সকলকে আইন ও আচরণবিধি মেনে চলতে হবে। এরই মধ্যদিয়ে সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে সমাজকে ইতিবাচক দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
তিনি বলেন, ডিজিটাল আইনে ৬৩টি ধারা রয়েছে। যার মধ্যে ৮টি ধারায় সাংবাদিকরা বিপদে পড়তে পারে। আপনারা যারা রাজধানীর বাইরে সাংবাদিকতা করছেন, এমন ভাববেন না আপনারা পিছিয়ে আছেন। আপনার চাইলে প্রধানমন্ত্রীর সাথে বিদেশ সফরেও সফর সঙ্গী হতে পারেন। লাস্ট কয়েকটা সফরে তিনি বরিশাল, কুষ্টিয়া ও রাজশাহীর মত জেলা শহর থেকে সাংবাদিক নিয়ে বিদেশ সফরে গেছেন। আপনারাও আবেদন করতে পারেন। হয়তো সময় লাগবে কিন্তু ধারাবাহিকভাবে সুযোগ পাবেন। আপনাদের এলাকায় যে সকল সরকারি জমি রয়েছে, সেখানে আপনারা সাংবাদিক পল্লী বা হাউজিং প্রকল্প হাতে নিতে পারেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের ব্যপারে খুবই আন্তরিক। তার নিকট শুধু সুন্দর করে উপস্থাপন করতে হব। তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেন, সে ব্যাপারে আমরা আপনাদের সাহায্য করবো, আপনারা কাগজ রেডি করেন।
সাংবাদিকরা স্বাধীনতা ভোগ করছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর অর্থ এই নয় যে, অসত্য বিষয়কে সত্য হিসেবে দাড় করাতে হবে। আমাদের ধারণ ও লালন করতে হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে। বাঙালি সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দিতে হবে। সাংবাদিকের স্বাধীনতা আইন ও সংবিধান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত মন্তব্য করে তিনি বলেন, দেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োজন রয়েছে নানা কারণে। কারণ বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিকতার নামে এক শ্রেণির মানুষ মিথ্যা তথ্য দিয়ে জাতি ও সমাজকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে। তবে বিদ্যমান ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কতকগুলো ধারা সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ নয় বরং তা ক্ষতিকর এই বিবেচনায় তা সংশোধন করা হবে। তিনি সাংবাদিকদের হলুদ সাংবাদিকতা পরিহারের আহবান জানিয়ে আরও বলেন আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকা অনেক বেশি সর্বনাশ ডেকে আনছে। তাদেরকে আইনের আওতায় আসতে হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো হু হু করে অনলাইন সংবাদপত্র বৃদ্ধি পাচ্ছে। যে কেউ একটি পত্রিকা খুলে যা ইচ্ছা তাই লিখে ব্লাকমেইলিং করছে। দেশের সব অনলাইন পত্রিকা প্রকাশের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকবে জানিয়ে তিনি বলেন, এমনটি হলে লেখাপড়া না জেনে যে কেউ একটি পত্রিকা খুলে সমাজের উপকারের বদলে ক্ষতি করতে পারবে না।
মতবিনিময় সভায় জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামালের সভাপতিত্বে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের যুগ্মসচিব মো. শাহ আলম। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সিনিয়র সহ সভাপতি মো. ওমর ফারুক, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের নির্বাহী সদস্য খায়রুজ্জামান কামাল ও সাতক্ষীরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইলতুতমিশ।
সভায় সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল বলেন, সাতক্ষীরার সাংবাদিকরা সরকারের সব বিষয়কে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরে সমাজের কল্যাণ কাজ করছেন। সাতক্ষীরা কিছুদিন ধরে অন্ধকার সময় পার করেছে, আর এখন পার করছে আলোকিত সময় উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের বাঙালি সংস্কৃতি ও মুক্ত চিন্তা ধারণ করতে হবে। সাংবাদিকদের পেশাগত দক্ষতার নজির তুলে ধরতে হবে। তারা যেমন গঠনমূলক সমালোচনা করতে পারবেন তেমনি তাদেরও থাকতে হবে জবাবদিহিতা। তিনি বলেন, দেশের সবাই যেমন মোনাজাতউদ্দিন নন, তেমনি সবাই আরজ আলি মাতুব্বরও নন। সাংবাদিকরা যেমন তাদের পেশার মাধ্যমে সমাজের বিচার করেন তেমনি সমাজও সাংবাদিকদেরও বিচার করে জানিয়ে তিনি বলেন, তারা কখনও প্রশ্নের বাইরে নন। আমরা সবাই সব সময় বিচারের কাঠগড়ায় রয়েছি এমন মন্তব্য করে জেলা প্রশাসক বলেন, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে অনেক দূর এগিয়ে দেয়। আর নেতিবাচক কাজ আমাদের সমাজকে কেবলই পিছিয়ে দিতে পারে। জেলা প্রশাসক বলেন, সাতক্ষীরার সাংবাদিকরাও যেমন আলোচিত তেমনি তাদের সমালোচনা গ্রহণেরও মানসিকতা থাকতে হবে।
সভায় সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা এবং সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন সাতক্ষীরা প্রেস ক্লাবের সভাপতি অধ্যাক্ষ আবু আহম্মেদ, সাধারণ সম্পাদক মমতাজ আহমেদ বাপী, সুভাষ চৌধুরী, কল্যাণ ব্যানার্জি, আবুল কালাম আজাদ, এম কামরুজ্জামান, ড. দিলিপ কুমার দেব, মোস্তাফিজুর রহমান উজ্জল প্রমুখ।
এসময় সাংবাদিকরা বলেন, একটি দেশের সংবাদপত্র যদি স্বাধীন না হয় তাহলে জাতি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। এজন্য শক্তিশালী সংবাদ কর্মী গড়ে তুলতে হবে। পত্রপত্রিকার সাংবাদিকদের জন্য বুনিয়াদি ও টেলিভিশনের জন্য ক্যামেরা প্রশিক্ষণ করানোর প্রয়োজন। জেলায় লাগামহীন অনলাইন পত্রিকা বেড়ে চলেছে যেগুলোর ন্যূনতম কোয়ালিটি নেই। তারা যাকে তাকে কার্ড দিয়ে দিচ্ছে সাংবাদিকতার। আর তারা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বিভিন্ন অফিস আদালত, যা প্রকৃত সাংবাদিকদের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। সাংবাদিকতায় সেই ১৯৭৪ সালের আইন এখনো প্রচলিত রয়েছে। এটা সংশোধনের দরকার।
তারা আরও বলেন, যখন হাতে লেখা সংবাদ প্রকাশ করা হতো তখন সাংবাদিকতার একটা মান ছিল। এখন ইমেল কম্পিউটার হয়ে একই সংবাদ সব পত্রিকায় হুবুহু ছাপা হয়। অনেক জাতীয় দৈনিকেও আজ একই অবস্থা বিরাজ করছে। একই নিউজ কেউ ছাপে প্রথম পাতায় কেউ ছাপে ভেতরের পাতায়। লেখার কোনো পার্থক্য নেই। একজন লেখে বাকি সবাই কার্বন কপি করে।

Leave a Reply