ফাহাদ হোসেন:
ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না সাতক্ষীরা বিআরটিএ অফিসে। দালালের মাধ্যমে ঘুষ দিয়ে কাজ উদ্ধার করতে বাধ্য করা হয় সেবা গ্রহীতাদের। নানা ছল চাতুরি করে অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে পিয়ন পর্যন্ত ঘুষ দিতে বাধ্য করেন সেবা গ্রহীতাদের। এটা যেন একটা নিয়মে পরিণত হয়ে গেছে। আর ঘুষ খাওয়াও অভ্যাসে পরিণত হয়েছে সংশ্লিষ্টদের। এতে সরকারের এই জনগুর”ত্বপূর্ণ দপ্তরটি সেবা প্রধানকারীর রূপ পরিবর্তন করে হয়রানির দপ্তরে পরিণত হয়েছে।
সাতক্ষীরা বিআরটিএ অফিসে গত এক মাস ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে এমনটিই জানা গেছে।
অনুসন্ধানকালে দৈনিক সুপ্রভাত সাতক্ষীরার হাতে এসেছে ঘুষ-দুর্নীতির কিছু দালিলিক প্রমাণও।
নানভাবেই বেরিয়ে এসেছে বিআরটিএ অফিসারদের ঘুষ বাণিজ্যের আধুনিক নিয়ম। মাধ্যম ছাড়া কোনো সেবা দিতে অপারগতা জানান স্বয়ং বিআরটিএ’র সহকারী পরিচালক (ইঞ্জি.) নাসির”ল আরিফিন নিজেই। ফলে সাধারণ মানুষকে বিআরটিএ’র সেবা পেতে নানা ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
সূত্র জানায়, দালাল না ধরলে নতুন গাড়ির নিবন্ধন ফরম জমা নেয় না সাতক্ষীরা বিআরটিএ অফিস। আর দালালের মাধ্যমে ফরম জমা দিতে গেলে ১৫শ থেকে ২ হাজার টাকা অতিরিক্ত দিতে হয়। এমন একাধিক অভিযোগ আসে দৈনিক সুপ্রভাত সাতক্ষীরা অফিসে। সত্যতা জানার জন্য বিআরটিএ’তে আবেদন ফরম জমা দিতে না পেরে ফিরে আসা এক ব্যক্তির ফরম নিয়ে পরিচয় গোপন রেখে জমা দেওয়ার চেষ্টা করে সুপ্রভাত সাতক্ষীরা অনুসন্ধান টিমের এক সদস্য। অনুসন্ধানের স্বার্থে আবেদন ফরমটি দালালের নিকট থেকেই সঠিকভাবে পূরণ করে জমা দেওয়ার চেষ্টা করা হয় নির্ধারিত স্থানে। কিন্তু বিআরটিএ অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মচারী সরাসরি জানিয়ে দেন সহকারী পরিচালকের স্বাক্ষর ছাড়া তারা সরাসরি কোনো ফরম জমা নেন না।
পরে সরাসরি বিআরটিএ সাতক্ষীরা সার্কেলের সহকারী পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মো. নাসির”ল আরিফিনের কাছে ফরমটি জমা দেয়ার চেষ্টা করা হয়। তিনি বিভিন্ন তালবাহানার একপর্যায়ে বিরক্ত হয়ে ফরমের কোনায় লিখে দিলেন ‘শোর”ম কর্তৃক জমা’।
তার র”ম থেকে কাগজ হাতে বের হলেই কয়েকজন দালাল সামনে হাজির হয়। তাদের কথা ‘গাড়ির কাগজ করবেন ভাই? আমার কাছে দেন। কম খরচে করে দেবো। অকারণে সময় নষ্ট করে লাভ নেই, এভাবে পারবেন না।’ তার কাছে কাগজ করতে সম্মতি জানানোর এক পর্যায়ে সে নিয়ে যায় উকিলবারের পাশে। সেখান থেকেই হয় টাকার চুক্তি। দেখে বোঝা যায়, এখানে কয়েকজন সহকারী দালাল পোষা হয়। যাদের কাজ- ফাইল হাতে ঘুরাঘুরি করা মক্কেল ধরে আনা। তবে এরকম জায়গাও একটা নয়। আছে আরো কয়েকটা। একটা রেডি কাগজ শুধু জমা দিতেই তাদের চার্জ দেড় হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। আলোচনার এক পর্যায়ে তারা বলেই ফেলে, ভাই এত টাকা যদি আমরা নিজেরা নিতাম তাইলে তো বড়লোক হয়ে যেতাম। অফিসাররা সরাসরি টাকা নিতে পারে না। তাই টাকা আমরা তুলে তাদের দেই। আমাদের থাকে খুব সামান্য। আমরা ফরম জমা দিলে নির্দিষ্ট চিহ্ন থাকে, যেটা দেখলেই সহজে ফাইল রেডি হয়। কিন্তু আপনি জমা দিলে তো কষ্ট করে পারবেন না। কতবার হাটবেন? কিছু মাল না পাইলে ফরমে সমস্যার শেষ হয় না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছু অবসরপ্রাপ্ত এক সেনা কর্মকর্তা জানান, বিআরটিএ’তে টাকা ছাড়া কোনো কাজ হয় না। আমি নিজে ফরম জমা দিতে না পেরে অবশেষে দালালের মাধ্যমে দু’হাজার টাকা বেশি দিয়ে ফরম জমা দিয়েছি। আজ ফিঙ্গার দিতে আসলাম। এখানে ওরা ১শ টাকা চাইলো। আমি কারণ জানতে চাইলে ওরা বলে এটাই নিয়ম, সবাই দেয়। আপনাকেও দিতে হবে।
অভিযোগ পেয়ে, ফিঙ্গার দেওয়া র”মের সামনে দাড়িয়ে একাধিক ব্যক্তির সাথে কথা বলে এর সত্যতা মেলে- বাড়তি ১শ টাকা ছাড়া কেউই পার পায়না সেখান থেকে।
এমন সময় একজন ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে বের হন। তার কাছে গিয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, এখন ড্রাইভিং লাইসেন্স নিতে গেলে তারা মিষ্টি খাইতে টাকা চাইলো। প্রথমে দিতে অস্বীকার করলেও ১০০ টাকা না নিয়ে ছাড়লো না।
আরেক সেবা গ্রহীতা জানান, তিনি আসছিলেন ড্রাইভিং লাইসেন্সের ফিঙ্গার প্রিন্ট দিতে, ফিঙ্গার দেওয়া হলেই তারা ১শ টাকা টাকা চায়। ওদের সাথে ঝামেলা করে পারবো না তাই দিলাম।
দীর্ঘ এক মাস বিআরটিএ নিয়ে অনুসন্ধান করে জানা যায়, বিআরটিএ’র ঘুষ গ্রহণের আওতা এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। যারাই প্রভাব খাটিয়ে ঘুষ ছাড়া ফাইল জমা দেয়, তাদের নিকট থেকে টাকা নেয়ার রয়েছে অভিনব সব কৌশল। তাদেরকে হয়রানি করা হয় নানান ভাবে। এরকম এক সেবা গ্রহণকারীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, তিনি ফিঙ্গার প্রিন্ট দেওয়ার জন্য গেলে তিনঘণ্টা ইচ্ছাকৃতভাবে দাড় করিয়ে রেখে বলে আপনার ফাইলে অভিযোগ আছে। আরো একঘণ্টা পরে আসেন। এটাতে আসলে সিকিউরিটি সমস্যা আছে। আপনি শো র”মে কথা বলেন। উনাদের বুঝানো আছে কি করতে হবে, দেখালেই বুঝতে পারবে।
পাশে দাড়িয়ে থাকা দালাল গোপনে ১৫শ টাকা চেয়ে বলেন, আমি সমাধান করে দেবো। সমস্যা হবে না।
পরে বিআরটিএ’র কথা মত শো র”মে গেলে তারা জানায়, টাকা না পাইলে কোনো সমাধান হবে না। কাউকে না বলার শর্তে শোর”ম প্রতিনিধি জানায়, এক হাজার টাকা দিলে সব সমাধান হয়ে যাবে। তারা সরাসরি টাকা চাইতে পারে না তাই আমাদের কাছে পাঠিয়ে টাকা নেয়।
এ ব্যাপারে বিআরটিএ’র অরিতিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক ইঞ্জিনিয়র মো. নাসির”ল আরিফিনের কাছে সিকিউরিটি প্রবলেম সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, এটা অনলাইনে কিছু কোডের সমস্যা। সহকারী পরিচালকের নিকট রেজিস্ট্রেশনের নিয়ম সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, আপনারা শো র”মে কথা বলেন। যে আপনার কাছে গাড়ি বিক্রয় করেছে, সেই রেজিস্ট্রেশন করে দেবে। আপনি সব বুঝবেন না। আপনাকে হেল্প করার জন্য ওরা।
ওরা শুধু জমা দেওয়ার জন্য দু’হাজার টাকা চায়- এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সহকারী পরিচালক জানান, তারা সার্ভিস দিলে চার্জতো কিছুটা নেবেই। যদি কেউ সঠিকভাবে ফরমপূরণ করে জমা দিতে চায় তাদের জন্য আপনাদের কি ব্যবস্থা রয়েছে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আপরি কেন দ্বারে দ্বারে ঘুরবেন? আপনার কাজ সহজ করার জন্য ওরা।
পরে সরকারি জাতীয় সেবার হট লাইন ৩৩৩-এ কল করে নতুন মোটর সাইকেলের রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি জানতে চাইলে জানানো হয়, বিআরটিএ’র ওয়েব সাইটে গিয়ে সেখানে যে রিকয়্যারমেন্ট রয়েছে- সেটা দেখে সেই অনুযায়ী আপনাকে কাগজ সাবমিট করতে হবে। একাজ করতে শোর”মের লোকজন বা কোনো দালালের প্রয়োজন নেই। সাতক্ষীরা বিআরটিএ’তে কারোর কাছ থেকে সরাসরি আবেদন গ্রহণ করা হয় না এমন কথা বললে তিনি জানান, এ রকম হওয়ার কথা না। আপনারা সহকারী পরিচালক যিনি আছেন, তার নিকট অভিযোগ দেন। তিনি ব্যবস্থা নেবেন।
