শ্যামনগর উপকূলে বন্ধ হচ্ছে না রেণু ধরা, ধ্বংস হচ্ছে বৈচিত্র্য
গাজী আল ইমরান, শ্যামনগর: সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বিভিন্ন নদী থেকে বন্ধ হচ্ছে না বিভিন্ন প্রজাতির মাছের রেণু ধরা। বঙ্গোপসাগরের একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চলের মৎস্য সম্পদ দিন দিন কমে যাওয়ায় সরকারিভাবে উপকূলীয় জলাশয়ের ১০ মিটারের কম গভীরতায় ক্ষতিকর জাল ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও মানছে না অসাধু ব্যবসায়ীরা। সরজমিনে দেখা যায়, ভোরের সূর্য উঁকি দেওয়ার আগেই উপজেলার কাশিমাড়ি পারশে মাছের ঘাট, ভেটখালি বাজার, হরিণগর বাজার, মুন্সিগঞ্জ বাজারসহ বিভিন্ন পয়েন্ট থেকেই রেণু পোনা বিভিন্ন সিন্ডিকেট সদস্যদের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় চলে যায়। রেণু পোনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পারশে মাছের পোনা, বাগদার পোনা, গলদার পোনা, পায়রা মাছের পোনা। মৎস্য সংরক্ষণ আইন ১৯৫০ অনুযায়ী বেহুন্দি জাল, কারেন্ট জাল, মশারী জাল, পাই জাল, টং জাল দ্বারা মৎস্য আহরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এরপরেও থেমে নেই এই অবৈধভাবে বৈচিত্র্য ধ্বংসের ব্যবসা।
নদী থেকে আহরণের পরে পোনাগুলোকে কাছাকাছি প্লাস্টিকের বড় পাত্র বা ড্রামে রাখা হয়। পাত্র ভর্তি হলে নদীর পাড়ে তোলা হয়। রেণু বিক্রির জন্য নীলডুমুর বিজিবি ক্যাম্প সংলগ্ন নদীর পাড়ে, সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারি বন কর্মকর্তার কার্যালয় সংলগ্নে রাস্তার উপর, হরিণগর বাজার, ভেটখালি বাজার সংলগ্নে নদীর পাড়ে অবৈধভাবে গড়ে তোলা হয়েছে শত শত ঘর। এইসব ঘরে এবং ঘরের বাইরে বসে দিনরাত জেলেরা শুধু চিংড়ি, পারশে, পায়রা মাছের পোনা সংরক্ষণ করে বাকি পোনা বা অন্যান্য প্রজাতির রেণুগুলো মাটিতে ফেলে দেয়। ফলে অন্য প্রজাতির মাছের পোনা মরে যায়।
কাশিমাড়ি ঝাপার নৌ-ঘাটে দীর্ঘদিন পারশে মাছের রেণু বিক্রি হওয়ার কারণে নাম করণ হয়েছে পারশে মাছের ঘাট। কালিগঞ্জ থেকে রেণু নিতে আসা জয়দেব ঘোষ নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, কাশিমাড়ি পারশে মাছের ঘাটে প্রতিদিন ৮-১০ টি রেণু পোনার ট্রলার আসে। যেসমস্ত ট্রলারে এক একটি ট্রলারে ২০০ কেজির বেশি রেণু পোনা থাকে। ১ কেজিতে সংখ্যায় কত কেজি মাছ পাওয়া যায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, কেজিতে ১৫-২০ হাজার মাছের পোনা থাকে। এই মাছের সাথে অন্য কোন মাছের রেণু আসে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, অবশ্যই বিভিন্ন ধরণের বৈচিত্র্যময় রেণু থাকে। সেগুলি পারশে মাছের রেণু নেওয়ার পরে নদীর পাড়ে ফেলে দেওয়া হয়। অর্থাৎ ১০ টি ট্রলারে প্রায় ২-৩ কোটি প্রয়োজনীয় রেণু নিলেও অন্যান্য বিভিন্ন জাতের আরও ১-২ কোটি রেণু ধ্বংস করা হয় প্রতিনিয়ত।
একাধিক জেলে জানান, পোনা আহরণ করে জেলেরা স্থানীয় মহাজন বা আড়ৎদারের কাছে বিক্রি করা হয়। পরে তারা বিভিন্ন মাধ্যমে প্রতিটি পোনা ১-২ টাকায় কিনে তা ৩-৪ টাকায় ঘের মালিকদের কাছে বিক্রি করে। এইসব পোনা সাতক্ষীরা জেলার চিংড়ি ঘেরগুলোতে পাঠানো হয়। শুধু কাশিমাড়ি এলাকা থেকেই দৈনিক লক্ষাধিক চিংড়ি পোনা জেলার বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেণু ব্যবসায়ীরা জানান, উপকূলীয় অঞ্চলের কয়েক হাজার মানুষ নদীতে চিংড়ি পোনা আহরণ করেই জীবিকা নির্বাহ করছে। এবিষয়ে স্কুল শিক্ষক মাহমুদুর রহমান বলেন, প্রাকৃতিক উৎস হতে বেপরোয়াভাবে এ রেণু ধরা বন্ধ করা দরকার।
এবিষয়ে উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা ফারুক হোসেন সাগরের সাথে কথা হয়। তিনি বলেন, অবৈধভাবে রেণু না ধরতে জেলা মৎস্য কর্মকর্তার নির্দেশে সর্বসাধারণের অবগতির জন্য মাইকিং এবং লিফলেট বিতরণ করেছি। বিভিন্ন সময়ে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে বন্ধ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তিনি আরো বলেন গত ২১ জানুয়ারি মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকালীন পরিত্যক্ত অবস্থায় ১০০০ ফুট বেহুন্দি জাল দেখতে পাই যেটি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে ধ্বংস করে ফেলি। কিন্ত আমরা জালের মালিককে খুঁজে পাইনি। আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে তারা জাল ফেলে পালিয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এবিষয়ে সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারি বন কর্মকর্তা মো. রফিক আহমেদ বলেন, রেণু আহরণকারীদের বিরুদ্ধে আমাদের টিম কাজ করছে। আমরা অনেকগুলো জাল ধরতে পেরেছি। তবে আমি তদন্তের কাজে বাইরে থাকায় সংখ্যাটা বলতে পারছি না।

Leave a Reply