দেবহাটা সরকারি বিবিএমপি ইনস্টিটিউশনের শতবর্ষ পূর্তি আজ
মীর খায়রুল আলম, দেবহাটা: দেবহাটার বিবিএমপি ইনস্টিটিউশনের শতবর্ষ পূর্তি অনুষ্ঠান আজ। এ উপলক্ষ্যে র্যালি, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, স্মৃতিচারণ, আলোচনা সভা, পুরস্কার বিতরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন রয়েছে। এসব আয়োজনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া শতবর্ষকে স্মরণ রাখতে একটি কল্যাণ ফান্ড গঠন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের ১১জন সদস্যসহ প্রতিষ্ঠানের কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা প্রদান করা হবে।
প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাস থেকে জানা যায়, ভারত বাংলা সীমান্তের ইছামতির তীরে অবস্থিত দেবহাটা উপজেলার সদর হতে কিছু দূরেই কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শতবছরের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দেবহাটা সরকারি বিবিএমপি ইনস্টিটিউশন। বৃটিশ শাসন আমলে অসংখ্য জমিদারের বসতি ছিল দেবহাটা ও টাউনশ্রীপুর এলাকায়। নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে জমিদারদের রাজধানী। গড়ে ওঠে বহু শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান।
১৯১৯ সালে দেবহাটার প্রখ্যাত জমিদার ফনিভূষণ মন্ডল তার বাবার নামে বিবিএমপি ইনস্টিটিউশন (বিপেন বিহারী মেমোরিয়াল পাবলিক ইনস্টিটিউশন) নামকরণ করেন প্রতিষ্ঠানটির। ঔপনিবেশিক শাসন, পাকিস্তানের শোষণ-নিপীড়ন আর স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়সহ তিন কালের সাক্ষী হয়ে শতবছর পূর্ণ করলো এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ১৯১৯ সালে যাত্রা শুরু করা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি ১৯৮৫ সালে এমপিওভুক্ত হয়। ২০১৮ সালের ৭ মে দেবহাটা বিবিএমপি ইনস্টিটিউশন জাতীয়করণ করেছে বর্তমান সরকার। ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভারতীয় উপমহাদেশের বিট্রিশ-বাঙালির শিক্ষা-দীক্ষা, আন্দোলন-সংগ্রাম, ইতিহাস আর ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতীক।
বিদ্যালয়ের ৫৩ জন শিক্ষার্থী মহান স্বাধীনতার যুদ্ধে অংশ নেন। যার মধ্যে কুলিয়ার সম্মূখ যুদ্ধে শহীদ আবুল কাশেম ও গোলজার হোসেন শাহাদাৎ বরণ করেন। যুদ্ধকালীন জেনারেল এজি ওসমান গণি, মেজর আব্দুল জলিল, নূরুল হুদাসহ আরো অনেকে দেবহাটায় আসেন আর এই বিদ্যালয়ে সভা করেন। যুদ্ধকালীন মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন গোপন মিটিং ও আস্তানা হিসাবে বিদ্যালয়টি ব্যবহার হওয়ায় প্রতিষ্ঠানের নথিপত্র পুড়িয়ে দেয় খান সেনারা। তারপরেও থেমে ছিল না প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম।
১৯২৩ সাথে প্রথম এন্ট্রান্স পরীক্ষার্থীদের জন্য প্রধান শিক্ষক কলিকাতা বিশ^বিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করলে টাউনশ্রীপুর এলাকার জমিদারদের বিরোধিতায় অনুমতি না পাওয়ায় তাদের জীবন হতে একটি বছর পিছিয়ে যায়। প্রতিষ্ঠাতা জমিদার ফনিভূষণ মন্ডলের ব্যক্তিগত অর্থে ভারতের বিখ্যাত বেনারস হিন্দু বিশ^বিদ্যালয়ে পরবর্তী বছর পরীক্ষার অনুমতি পেয়ে ১৯২৪ সালে প্রথম এন্ট্রান্স পরীক্ষার্থী হিসাবে ৯ জনের মধ্যে চার জন পাশ করেন। খ্যাতিজোড়া এই প্রতিষ্ঠানে বহু খ্যাতিমান প-িত, গবেষক ও জ্ঞানতাপসের ছোঁয়া রয়েছে। এখানে পড়েছেন একাত্তরের অসংখ্য বীর সন্তান, রয়েছেন সাবেক নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রাণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আজিজ হোসেন, এশিয়া মহাদেশের প্রখ্যাত চিকিৎসক ডা. অনুপম দাস গুপ্ত, সাবেক পূবালী, প্রিমিয়ারসহ কয়েকটি ব্যাংকের এমডি কাজী আব্দুল মজিদ, ড. আলমগীর কবির, লন্ডনের ব্যারিস্টার উম্মে হাবিবা, বিডি প্রেসের পরিচালক সাবেক আবু ইউসুফ, কানাডার কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার সোহরাব হোসেন মিলন, দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আব্দুল লতিফ, দেবহাটা কলেজের অধ্যক্ষ একেএম আনিসউজ্জামান, বিশিষ্ট অভিনেতা আব্দুল হান্নান, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতের সহকারী পরিচালক শরিফা ইমরোজ শিউলি, শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. মীর মাহফুজ আলম ও চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. মীর আশরাফুল কবিরসহ এদেশের অসংখ্য রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে নামকরা আরো অনেকে।
বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ৮১৯ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। রয়েছেন ১৬ জন শিক্ষক ও ৪ জন অফিস সহকারি। রয়েছে আধুনিক মাল্টিমিডিয়া সংযুক্ত প্রতিটা ক্লাস, ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব, ৪০টি কম্পিউটার সমন্বিত কম্পিউটার ল্যাব। আছে দক্ষ মনিটরিং ব্যবস্থা। রয়েছে দু’জন শিক্ষক ও একজন ছাত্রের সমন্বয়ে কাউন্সিলিং ব্যবস্থা। শিক্ষা-দিক্ষার পাশাপাশি স্কাউটিং। বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষক গৌর চন্দ্র পালের তত্ত্বাবধানে বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হরেক ফুল ও ফলের বাগান। শত বছরের বিদ্যালয়টি বর্তমানে শিক্ষা-দিক্ষা, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিসহ কোন কিছুতেই থেমে নেই। সব কিছুতে বিশেষ অবস্থান করে নিয়েছে। বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের ক্রীড়া নৈপূণ্যতায় জেলা, বিভাগ ও জাতীয় পর্যয়ে এনে দিয়েছে অসংখ্য সাফল্য।
প্রধান শিক্ষক মদন মোহন পাল বলেন, বিদ্যালয়টি শুরুতে ছাত্র ছিলেন জমিদার পরিবারের বলাই চাঁদ, কানাই চন্দ্র, নুর মোহাম্মদ খানসহ ১৩৯ জন ভর্তি হন। ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানটির প্রসার হতে শুরু করে। ঠিক সে সময় টাউনশ্রীপুর এলাকার জমিদাররা স্কুলটি বন্ধ করতে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র করতে থাকে। কিন্তু জমিদার ফনিভূষণ মন্ডল একজন সুশিক্ষিত মানুষ হওয়ায় সব বাধা অতিক্রম করে কোলকাতা বিশ^বিদ্যালয় থেকে স্থায়ী স্বীকৃতি লাভ করে। শতবর্ষ পূর্তি উদ্যাপনে বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।
শতবর্ষ উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আনোয়ারুল হক জানান, শতবর্ষের এই উৎসবে বিদ্যালয়টির বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে মিলনমেলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আশা করছি বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ পরিণত হবে মহা মিলনমেলায়।

Leave a Reply