রণাঙ্গনের গল্প: রাতে রেকী করে কালিয়া থানায় আক্রমণ করি
dav আরিফুল ইসলাম রোহিত: বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ আব্দুল ওয়াজেদ কচি। গ্রামের বাড়ি নড়াইল জেলার কামালপ্রতাপ গ্রামে। বর্তমানে থাকেন সাতক্ষীরা শহরের রাজার বাগান উত্তরপাড়ায়। ১৯৭০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন তিনি। তখন তার বয়স ১৬ কি ১৭। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের কিছুদিন পর শেখ আব্দুল ওয়াজেদ কচি চাকরির আশায় চলে যান ঢাকায়। তখন স্থলপথে যাওয়া-আসার সুযোগ না থাকায় গিয়েছিলেন লঞ্চযোগে। মামাতো ভাই সরকারি চাকুরিজীবী হওয়ার সুবাদে তিনি বেশ কিছুদিন রাজধানীতে ঘোরাঘুরি করেন। কিন্তু হঠাৎ একদিন বাড়ি যেতে বলেন তার ভাই। তিনি জানালেন দেশের অবস্থা ভালো না। চাকরি করা হলো না তার। বাড়ি ফিরে কিছুদিন যেতে না যেতেই ২৫ মার্চ রাতে গণহত্যার ঘটনা জানতে পারেন তিনি। এরপরে নানা ঘটনা পরিক্রমায় যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে।
মুক্তিযুদ্ধকালীন বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরে তিনি দৈনিক সুপ্রভাত সাতক্ষীরাকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাতকারে বলেন, সময় তখন ২৬ মার্চ, ১৯৭১। আমাদের গ্রামে তখন একটি মাত্র ট্রানজিস্টর (রেডিও) ছিলো। কাজ ছিলো না বলে তাতে কয়েকজন মিলে গান শুনতাম। ২৬ মার্চ রেডিও’র মাধ্যমে জানতে পারলাম ঢাকায় অনেক মানুষকে মেরে ফেলেছে পাকিস্তানিরা। তারপর চলে গেল আরও দুটি মাস। সবসময় ট্রানজিস্টরে খবর শুনে সময় কাটতো আমাদের। খবর শুনতাম আকাশবাণী কোলকাতার। সেখানে শুধু মুক্তিযুদ্ধের খবর পড়তেন দেবদুলাল বন্দোপাধ্যায়। ভরাট গলায় যুদ্ধের নির্যাতনের কাহিনী শোনার সাথে সাথে আমাদের রক্ত গরম হয়ে যেতো। কেউ কেউ জয় বাংলা ধ্বনি উচ্চারণ করতো। এছাড়া জয় বাংলা বেতার থেকে ইমরুল হোসেন মুক্তি বাহিনীর সাফল্য চমৎকারভাবে তুলে ধরতেন। তখন আমি ভাবতাম আমিও মুক্তি বাহিনীতে নাম লেখাবো, যুদ্ধ করবো, দেশ স্বাধীন করবো। আমার আশা পূরণ হলো। একদিন রাতে বিশাল দেহের এক ব্যক্তি এসে হাজির আমার বাড়িতে। তার নাম মোসলেম। বাড়ি নড়াইল শহরে। তিনি ইপিআরের হাবিলদার। তিনি আমাকে বললেন মুক্তিযুদ্ধ করতে হবে। অস্ত্র আমি দেব। কথা শুনে আমি তো হতবাক। এ যেন মেঘ না চাইতে বৃষ্টি। মোসলেম বলেন, অস্ত্র আনতে যেতে হবে। কিন্তু কোথায় তা বললেন না। আমার এক চাচাতো ভাই জিকু, আমি এবং মোসলেম এড়েন্দা থেকে একটি নৌকায় নবগঙ্গা নদী দিয়ে চিত্রা নদীতে গিয়ে পৌঁছুলে নৌকার মাঝি বললেন, ভাই আমরা চলে এসেছি। মোসলেম মাঝিকে নৌকা ভেড়াতে বললেন। নৌকা থেকে নেমে হাটা শুরু করলাম। হঠাৎ মোসলেম আমাদের একটা বাড়িতে নিয়ে তুললো। রাতের আঁধারে দেখলাম ওই বাড়িতে দুটি মেয়েও আছে। তারা আমাদের খুব আপ্যায়ন করলো। মোসলেম কোথায় যেন চলে গেল। কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসে বললেন চলো এবার যেতে হবে।
আমরা নৌকায় ওঠার আগে দেখলাম মোসলেম নদীর ঘাটের দূরের এক ঝোপ থেকে চকচকে থ্রি-নট থ্রি রাইফেল আনলো। সাথে অনেক গুলি। বাড়ি ফিরে পরদিন থেকে গোপনে রাইফেল চালানো শিখলাম। এরই মধ্যে এলাকায় খবর হয়ে গেল আমি, আমার চাচাতো ভাই জিকু এবং মোসলেম মুক্তিযোদ্ধা।
একদিনের ঘটনা। হঠাৎ করে একদল লোক অস্ত্রসহ আমাদের বাড়ি ঘেরাও করলো। আমার পিতাকে অনেক শারীরিক নির্যাতন করলো। বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজলো আমাদের রাইফেলটি। কিন্তু পেল না। তারা চলে গেল। এর দু’দিন পরে মোসলেমকে খুঁজে পাওয়া গেল না আর। অনেক খোঁজাখুঁজির পর মোসলেমকে পাওয়া গেল পার্শ্ববর্তী আমাদা গ্রামের ধান ক্ষেতে, হাত-পা বাঁধা, মৃত। তার কাছে রাইফেলটি নেই। তবে মোসলেমের লাশ দাফন করা সম্ভব হয়নি।
আব্দুল ওয়াজেদ কচি আরও বলেন, এই ঘটনার পর থেকে আমি আর চাচাতো ভাই জিকু পালিয়ে পালিয়ে দিন যাপন করি। কিছুদিন এভাবে চলার পরে জিকু বললো, ভাই চলো যুদ্ধে যাই। ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়ে আসি। তখন ভাবলাম- তাই তো পালিয়ে না থেকে চল ভারতে যাই। দু’জনেরই একটা লুঙি আর জামা পরা ছিলো। সেভাবেই চলে গেলাম। দু’রাত অচেনা পথঘাট পেরিয়ে ভারতে গিয়ে পৌঁছেই দেখা হলো আমাদের গ্রামের সুভাষের সাথে। সেও তার পরিবারের সাথে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। পরে ভারতে থাকা লোহাগড়ার বাসিন্দা এমসিএ লে. মতিয়ার রহমানের কাছে গেলাম। তিনিই আমাদের ভর্তি করে দিলেন ৫নং টালীখোলা ক্যাম্পে। থাকলাম ৫-৬ দিন। এরপর আমাদের পাঠানো হলো বারাকপুর ট্রেনিং সেন্টারে। বারাকপুরে লাঠির সাহায্যে ট্রেনিং দেওয়া হতো। ক্যাম্প কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন আর কে মুখার্জী। সেখানে আমাদের দেয়া হলো সেলাইবিহীন ২টা করে লুঙি। ওখানে খাবারের লোভে ইচ্ছা করে নাইট ডিউটি নিতাম। এভাবে কেটে গেলো আরও কয়েক দিন।
একদিন রাতে আমাদের দেওয়া হলো ১৪টা করে শুকনো রুটি। আর বলা হলো এটা দু’দিনের খাবার। আমাদের লকইন করে গণনা করা হলো। রাতেই আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো রেল স্টেশনে। উঠানো হলো কয়লা চালিত রেলে। রাতেই আবার নামলাম রামপুরহাট স্টেশনে। বিহারের বীরভূম জেলার রেলস্টেশন এটি। তারপর আমাদের সেনাবাহিনীর ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হলো অনেক দূরে। সেখানে আমাদের ২টা কম্বল, ১টা থালা ও একটি বড় মগ দেওয়া হলো। এখানেই শুরু হলো উচ্চতর প্রশিক্ষণ। সেখানেই আমাদের থ্রি নট থ্রি রাইফেল, মার্কফোর রাইফেল, এসএলআর, টু ইঞ্চ মর্টার, থ্রি ইঞ্চ মর্টার, এলএমজি, থার্টি সিক্স হ্যান্ড গ্রেনেড, রকেট লঞ্চার, বোতল বোমা, মানকি চাল, ভূত চাল নামক এসব অস্ত্রে ট্রেনিং দেওয়া হলো। এছাড়া অস্ত্র বিহীন কিভাবে যুদ্ধ করতে হবে সেই প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র খোলার কাজও শেখানো হলো। এভাবেই ২৮ দিন ধরে চললো আমাদের প্রশিক্ষণ। এই প্রশিক্ষণে আমি কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হলাম। আমি হয়ে গেলাম একজন গেরিলা যোদ্ধা। ২৮ দিন পর আমাদের ফিরে আসার কথা, কিন্তু আমি আর অধ্যাপক উজির আহমেদ খানসহ তৎকালীন যশোরের ১৮ জনকে রাখা হলো লিডারশিপ ট্রেনিংয়ের জন্য। সেই ট্রেনিং চললো আরও ২১ দিন। এরপর আমরা রানাঘাট রেস্ট ক্যাম্পে ফিরলাম।
আব্দুল ওয়াজেদ কচি জানান, এভাবেই কিছু দিন চলে গেল। পরে আমাদের আনা হলো সীমান্তের বয়রা ক্যাম্পে। ক্যাম্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত মেজর হুদা আমাদের ১০ জনের এক একটা টিম তৈরি করে প্রত্যেককে অস্ত্র দিয়ে পাঠাচ্ছেন দেশের ভেতরে যুদ্ধ করার জন্য। দেশের ভেতরে ঢুকে পড়লাম।
একদিনের ঘটনা, রাতের আঁধারে আমাদের বাহিনীকে পথ দেখিয়ে আনছে দু’জন গাইড। যশোর-ঝিনাইদহ সড়কের বারোবাজারে আসা মাত্রই বেধে গেল যুদ্ধ। সড়কের এপাশ আর ওপাশ। কিন্তু সকাল হতে দেখি এই যুদ্ধ পাক সেনাদের সাথে হয়নি, হয়েছে আমাদেরই মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে। শুধু সংকেত ভুলের কারণে। কিন্তু ভাগ্য ভালো যে আমাদের উভয়েরই কারও ক্ষতি হয়নি। যা হোক অনেক বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে বাগান, জঙ্গল, নদনদী খাল-বিল পেরিয়ে পৌঁছুলাম মধুমতি নদীর পাড়ের বড়দিয়ায়। সেখান থেকে আঠারো বেকী নদীর পাড়ে অবস্থিত লোহারগাতি গ্রামের সেনেদের পরিত্যক্ত একটি পাকা বাড়িতে। এটাই আমাদের নিরাপদ ক্যাম্প। শুরু করলাম গেরিলা যুদ্ধ। আমাদের টার্গেট বড়নাল গ্রামের রাজাকারের আস্তানা ধ্বংস এবং কালিয়া থানা মুক্ত করা। এরই পরিক্রমায় একদিন রাতের বেলা রেকী করে আক্রমণ চালালাম কালিয়া থানায়। সারারাত যুদ্ধ শেষে থানা অভ্যন্তরে থাকা ৬ জন পাক সেনাকে বন্দি করা হলো। এদের মধ্যে একজন ছিল বেলুচী আর অন্য পাঁচজন ছিলো পাঞ্জাবী। বিশাল দেহের বেলুচী গুলিতে আহত হয়। ওই বেলুচীকে মধুমতির পাড়ে নিয়ে হত্যা করা হয়। অন্য পাঁচ জনকে এলাকায় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখানো হয়। পরে তাদেরকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিলো। এভাবেই কালিয়া থানা পাক সেনা মুক্ত হয় ৯ ডিসেম্বর।
এর দু’দিন আগে পাক নৌবাহিনীর সাথে আমাদের যুদ্ধ হয়। ওই যুদ্ধে আমাদের একজন যোদ্ধা শহীদ হন। তাকে বড়দিয়ায় দাফন করা হয়েছিলো। সেখানে আজও তার কবরটি রয়েছে। এভাবে খণ্ড খণ্ড যুদ্ধের মধ্যদিয়ে দেশ স্বাধীন হয়। এরপরে অস্ত্র জমা দিয়ে বাড়ি ফিরে আসলাম বীরের বেশে। যখন ফিরে এলাম তখনকার কথা ভোলার নয়। বাড়ি এসে জানতে পারলাম আমার বড় ভাই আব্দুর রাজ্জাকও একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমরা দু’ভাই দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি, এটা ভাবতেই আনন্দ অশ্রু ঝরেছিল।

Leave a Reply