মীর খায়রুল আলম: এখন সরিষার ক্ষেতগুলোতে হলুদের সমারোহ। ফুল ফুটেছে, আবার অনেক জায়গাতে ছোট ছোট সবুজ দানা ঝুলছে। সেখান থেকে মধু সংগ্রহের এ মৌসুমকে কাজে লাগাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন মৌ চাষফরা। মধু বিক্রি করে নিজেদের ভাগ্য বদল করছেন কেউ কেউ।
কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, মৌমাছি থেকে আমরা মধু ও মোম পাই। মৌমাছিরা ফুলের পরাগায়ন ঘটিয়ে বনজ, ফলদ ও কৃষিজ ফসলের উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়। এই মৌমাছি বাক্সবন্দি করে লালন-পালন বা চাষ করা এবং অধিকতর লাভবান হওয়া যায়। আমাদের দেশে সাধারণত তিন প্রজাতির মৌমাছি পাওয়া যায়-পাহাড়ী, ভারতীয় ও ক্ষুদে মৌমাছি। ভারতীয় মৌমাছি আকারে মাঝারি ধরনের। অন্ধকার বা আড়াল করা স্থান গাছের ফোঁকর, দেওয়ালের ফাঁটল, আলমারি, ইটের স্তুপ প্রভৃতি স্থানে এরা চাক বাঁধে। চাক প্রতি মধুর উৎপাদন প্রতিবারে গড়ে প্রায় ৪ কেজি। তবে এরা শান্ত প্রকৃতির। তাই বাক্সে লালন-পালন করা যায়। প্রকৃতি থেকে ভারতীয় মৌমাছি (রাণী ও কিছু শ্রমিক) সংগ্রহ করে অথবা প্রতিষ্ঠিত মৌচাষীর নিকট থেকে ক্রয় করে মৌচাষ কার্যক্রম আরম্ভ করা হয়। বাক্সবন্দির প্রথম ৩/৪ দিন কৃত্রিম খাবার যথা চিনির ঘন সরবত বা সিরাপ দেবার প্রয়োজন হয়। এরপর মৌমাছিরা নিজেদের খাবার নিজেরা সংগ্রহ করে। কখনো কখনো পরিবেশে খাবার ঘাটতি পড়লেও কৃত্রিম খাবার দেওয়ার প্রয়োজন হয়। মধু সংগ্রহ করার সময় আস্ত চাক হাত দিয়ে চিপে মধু বের করা হয়। এছাড়া বাক্সে লালন-পালন করা মৌমাছির চাক থেকে মধু নিষ্কাশন যন্ত্রের সাহায্য মধু বের করা যায়। এতে চাক থেকে শুধু মধু বের হয়ে আসে, অথচ চাক নষ্ট হয় না এবং তা আবার ব্যবহার করা যায়। দেশে খাটি মধুর চাহিদা পূরণ করে পুষ্টিহীনতা রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ নিয়ে মৌমাছি পালন করলে এবং এলাকায় পর্যাপ্ত সহায়ক গাছ-পালা থাকলে একটি বাক্স থেকে মধু (শীতকালে) ৭/৮ কেজি এবং বছরে ১৮/২০ কেজি খাটি মধু সংগ্রহ করা যায়।
মধুচাষী বসন্তপুর গ্রামের আব্দুস সামাদের পুত্র রুহুল আমিন। তিনি প্রায় আট বছর ধরে এই পেশায় আছেন। তার প্রতিবেশী মহিদুল ইসলামের সাথে শুরু করেন মৌ চাষ। তারই হাত ধরে বর্তমানে তিনি স্বাবলম্বী। সে এবছর দেবহাটার ঈদগাহ বিলের সরিষা ক্ষেতে ৭৫টি টব বসিয়েছে। যেখানে সপ্তাহে প্রতিটি মৌ চাক থেকে পাঁচশ গ্রাম মধু পাবেন বলে তিনি আশাবাদী। তাদের সারা বছরের সংগ্রহ করা মধু এবি গ্রুপ সংগ্রহ করে। সে কারেণে ক্ষেত থেকেই তাদের পণ্য বিক্রি হওয়ায় বাড়তি খরচের দরকার হয় না। তবে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহায়তা পেলে আরো বেশি মধু উৎপাদন করতে পারবেন বলে তিনি জানিয়েছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জসিম উদ্দীন জানান, গত বছর দেবহাটার বহেরায় পরীক্ষামূলক টবে মৌ চাষ শুরু করা হয়। প্রথম পর্যায়ে কৃষকদের মঝে উৎপাদন কম হওয়ার ভয় ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেই ভয় কাটানো সম্ভব হয়েছে। সরিষার ক্ষেতে মৌ চাষ করা হলে এতে প্রাকৃতির থেকে ১০-১৫% বেশি পরাগায়ন ঘটাতে সাহায্য করে। সাথে সাথে ফলন দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়। তিনি আরো জানান, দেবহাটায় এবছর ১১২৫ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও আবাদ হয়েছে ১১৭৫ হেক্টরে। আগমীতে আরো বৃদ্ধি পাবে, সাথে সাথে স্বল্প পরিশ্রমে সরিষা ফুলের মধু চাষে পরিধি বৃদ্ধি করা হবে।
