রণাঙ্গনের গল্প: রাজাকার কমান্ডার সাত্তার মৌলানাকে হত্যা করি
এস.এম নাহিদ হাসান: বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল হক। শ্যামনগর উপজেলার চন্ডিপুর গ্রামের (সদর থানার উত্তর পাশে) কিনু সরদারের (বিল্লাল সরদার) ছেলে ফজলুল হক চার ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট। ১৯৭১ সালে ২২-২৩ বছরের টকবগে তরুণ ছিলেন ফজলুল হক। সাদাসিদে মানুষ হলেও বড় ভাইদের কাছে প্রতিনিয়ত দেশের গল্প শুনতেন তিনি। ৭ মার্চের ভাষণই বাঙালি জাতির মুক্তির বারুদ বলে মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন তিনি। সেই বিশ্বাসকেই পাথেয় করে বড় ভাই মজিদের নেতৃত্বে হাবিল রবীন গাইনদের সাথে বাড়ি থেকে পালিয়ে চলে যান মাতৃভূমি রক্ষার প্রশিক্ষণ নিতে। কালিগঞ্জ উপজেলার উপর দিয়ে হিঙ্গলগঞ্জের মধ্য দিয়ে টাকি পার হয়ে তুর্কি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পৌঁছান তারা।
মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরে ফজলুল হক দৈনিক সুপ্রভাত সাতক্ষীরাকে বলেন, তখন এপ্রিল মাস। সেখানে গিয়ে দেখি আমাদের মত বাংলাদেশ থেকে আরও অনেকে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে। ওখানে যারা দায়িত্বে ছিলো তারা আমাদের কাছে প্রশ্ন করলো আমরা কেন এসেছি। আমার বললাম যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে এসেছি। তারপর আমাদের নাম ঠিকানা সব লিখে নিলো। আমরা চারজন সেখানে প্রায় সাত দিন অবস্থান করলাম। তারপর ট্রাকে করে আমাদের বিহারের পাঠানো হলো। সেখানে আমাদের একমাস কঠোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কিভাবে গোপনে শত্রু পক্ষের উপর হামলা করে তড়িৎ গতিতে স্থান ত্যাগ করতে হবে, ক্রুলিং করা, অস্ত্র চালানোসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। আমাদের এলএমজি, স্টেনগান, ব্যাটাগান, থ্রি নট থ্রি, রাইফেল, স্পোজি, গ্রেনেড চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পরে বাগুনডে ক্যাম্পে আসি। সেখান থেকে চলে আসি হিঙ্গলগঞ্জ। সেখানে এমপি ফজলুল হক, ক্যাপ্টেন বেগ, বাশার, মেজর জলিলের সাথে দেখা হয়। তাদের মাধ্যমে শ্যামনগরের জন্য একটি টিম তৈরি করে দেয়া হয়, আমাদের টিমে ছিল ১২জন। এলএমজি, স্টেনগান, ব্যাটাগান, থ্রি নট থ্রিসহ বিভিন্ন অস্ত্র ছিল আমাদের সাথে। আমরা শ্যামনগরের ট্যাংরা খালি নদীর কিনারায় ক্যাম্প করি। আমাদের দলের নেতা ছিলেন মিজানুর রহমান। তার পরামর্শে আমরা সকল অপারেশন পরিচালনা করতাম। আমাদের সাথে বারিক গাজী, ইনতাজ মোড়ল, হাবিল, রবীন গাইনসহ আরও অনেকে ছিল। তখন শ্যামনগর থানায় রাজাকারদের ক্যাম্প ছিলো। সেখানে পুলিশ, খানসেনা ও রাজাকাররা থাকতো। একদিন ভোর রাতে থানায় আক্রমণ করি। তবে এ অভিযান আমরা সফল করতে পারিনি। তারা বাঙ্কারে অবস্থান করায় আমরা পেরে উঠিনি। পরে আমরা ক্যাম্পে ফিরে আসি। আমাদের কাছে হঠাৎ খবর আসে রাজাকার কমান্ডার সাত্তার মৌলানা থানায় আসছে। তার বাড়ি হয়তো মৌতলার দিকে হবে। সঠিক মনে নাই। তবে সে সময় সে সবচেয়ে বড় রাজাকার ছিলো। সে যখন রাতে রমজানপুর কালভার্টের সামনে আসে তখন গোলা বর্ষণ করে সাত্তার ও তার দলবলকে জায়গায় মেরে ফেলি। তখন রাজাকাররা এ খবর পেয়ে এ এলাকা ছেড়ে ভেগে যায়। আর থানায় যেসব রাজাকার ছিলো তারা আমাদের কাছে ধরা দেয়। তাদের কাছ থেকে আমরা অস্ত্র গুলি নিয়ে নেই। আমাদের অবস্থান শক্তিশালী হতে থাকে। অন্যদিকে যারা এলাকা থেকে ভেগে যায়, তারা গোপনে এ এলাকায় খান সেনাদের আনার চেষ্টা করে।
একদিন, সম্ভবত, মঙ্গলবার ভোরবেলা। এখনো মনে পড়ে, শ্যামনগরের হাট ছিলো সকালে, চন্ডিতলা খেজুরগাছ তলায় আমি ডিউটি করছিলাম। আর খেজুর খাচ্ছিলাম। আর আমার বন্ধুরা বিভিন্ন রাস্তার পাশে অবস্থানরত ছিলো। রাজাকাররা খানপুর থেকে পাকিস্তানি সেনাদের মেইন রাস্তা দিয়ে না এনে মাঠ ঘাট বাড়ির ভিতর দিয়ে শ্যামনগর নিয়ে আসে। একসময় আমার সামনে খানেরা এসে পড়ে। তারা গুলি করা শুরু করলে আমি জীবন নিয়ে কোনরকম খেজুর গাছের পিছনে পালালাম। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। আমাকে ধরে ফেলে। আমার বন্ধুরা সবাই অপ্রস্তুত ছিলো, তাই তারা যে যেভাবে পেরেছে জীবন বাচিয়েছে। আমাকে তারা পিট মোড়া দিয়ে বেধে আমাকে টানতে টানতে থানায় নিয়ে যায়। তখন রাজাকার শামছুর রাজাকার, মুনসুর সরদার এরা আমাকে গুলি করে মেরে দিতে বলে। তখন পাকিস্তানি অফিসার আমাকে কিছু না বলে খানপুরের ক্যাম্পের দিকে রওনা হয়। পথিমধ্যে আমার বন্ধুরা আবার পাকিস্তানিদের উপর হামলা করে। তবে আমাকে ছিনিয়ে নিতে পারেনি। এক পর্যায়ে আমাকেসহ আরো কয়েকজনকে যশোর সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে যেয়ে দেখি কারাগারগুলোতে মানুষ আর মানুষ। আমাদের আর ঢুকাতে পারলো না। তাই আলাদা এক ঘরে রাখলো। আমাদের পিছনে দেখি কাশবন বোঝায়। একদিন রাতে আমার সাথে যারা ছিলো তাদের বললাম চলো চলে যায়। কিন্তু তারা রাজি হয়নি। আমি একাই বের হয়ে আসি। পিচের রাস্তা পার হয়ে কাশবন সেটা পার হয়ে ধান ক্ষেত। মাজা সমান পানি এই ক্ষেতে। ধান ক্ষেতের শেষে তার কাটা। আল্লাহ’র নাম নিতে নিতে পানির নিচে দেখি ফাকা। ঐ ফাকা দিয়ে পার হয়ে আসি। তারপর দেখি রেল লাইন। রেল লাইন পার হয়ে আমি মুক্ত হই। তখনও আমার হাত বাধা ছিলো। আমাকে জানে না মারলেও বেইনেট দিয়ে কোমর থেকে পা পর্যন্ত খুচিয়ে খুচিয়ে রক্তাক্ত করে ফেলেছিলো। আমি রাত চারটার দিকে এক বাড়ি যেয়ে উঠি। তখন খুব বর্ষা হচ্ছে। হঠাৎ শরীরের দিকে তাকিয়ে দেখি আমার সারা শরীরে বড় বড় জোক বসে রক্ত খাচ্ছে। আমাকে তখন খেতে দেওয়া হলো। ইতোমধ্যে শরীর জ্বরে পুড়ছে। উনারা আমাকে সাবু, লেবুর পানি, ওষুধ দিয়ে সুস্থ করে তোলে। ঐ বাড়ির দুই ছেলেও মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলো। তাদের একজনের নাম সিরাজ। পুলিশে চাকরির সুবাধে যশোরে ঐ এলাকায় মনে মনে সিরাজ ও তার পরিবারকে খুঁজেছি। মানুষের কাছে শুনেছি কিন্তু কেউ বলতে পারেনি। তারপর যশোর থেকে ভারতে চলে যায়। সেখানে চিকিৎসা নেই। সেখান থেকে হিঙ্গলগঞ্জ ক্যাম্পে চলে আসি। আমাদের এমপি ফজলুল হক ও মেজর জলিল সাহেব বলেন, তুমি মেজর কাউসার সাহেবের সাথে বরিশাল চলে যাও। উনাদের কথামত নৌকার নিচে অস্ত্র বেধে নিয়ে কাইসার সাহেবের সাথে বরিশালে যায়। আমাদের সাথে ১০-১২টা নৌকা ছিলো। আমরা প্রথমে গৌরনদী থানার তরকি বাজারে অবস্থান গ্রহণ করি। সেখান থেকে পায়ে হেটে পয়সার হাটে যায়। সেখানেই আমরা প্রাথমিক ক্যাম্প করি। একদিন আমরা গৌরনদী থানা অক্রমণ করে সব পুলিশ ও রাজাকারদের মেরে অস্ত্র গুলি নিয়ে নেই। পরবর্তীতে সেখান থেকে ক্যাম্প গুটিয়ে আমরা চলে আসি উজিরপুরে। সেখানে আমরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দেখা পায়। তারা সেখানে ক্যাম্প করে আছে। তাদের ভারি অস্ত্রসহ গান বোট ছিল। কিন্তু আমাদের সে হিসেবে কিছুই ছিলো না। তাই আমরা বাধ্য হয়ে নদী পার হয়ে ওপারে গুপ্ত ক্যাম্প করি। সেখান থেকে নিয়মিত স্পাই ও রেকি করে খানসেনাদের নজরে রাখতাম। সুবিধাজনক সময়ে আমরা এসে গেরিলা আক্রমণ করেই স্থান ত্যাগ করতাম। আমাদের ক্যাম্পে যারা ছিলো তারা ভাগ করে করে ডিউটি করতো। আর চর হিসেবে রবিন, মিঠুসহ ৬জন ডিউটি করে পাকিস্তানিদের খবর আমাদের দিতো। একদিন আমাদের ক্যাম্পের পাশের একটি বাড়িতে দাওয়াত পড়লো। আমরা সেখানে গিয়ে খেতে বসলে হঠাৎ সেই বাড়ির বাচ্চারা খবর নিয়ে আসে বাড়ির দিকে খানেরা আসতেছে। আমরা পালিয়ে গেলাম। শুনেছি ওই বাড়ির লোকজনই খানদের নিয়ে আসতেছিলো। আমাদের না পেয়ে খানেরা ঐ বাড়ির দুই মেয়েকে ধরে নিয়ে যায়। পরে আমরা ঐ বাড়ি যেয়ে ঐ লোককে মেরে ফেলি। কয়েকদিন পর উজিরপুর থানায় হামলা চালিয়ে থানাটি দখলে নিয়ে আসি। পরে আমরা বরিশাল শহরে চলে যায়। সাত মাইলের পাশে নতুন বাজারে খালে আমরা নৌকা নিয়ে থাকতাম। আমাদের নৌকায় কিছু মাছ ছিলো, সেগুলো বিক্রি করতাম। হাতিয়ার থাকতো পানির নিচে। ওখানে বগুড়া নামে একটা পুলিশ ফাড়ি ছিলো। আক্রমণ করে সেটাও দখলে নেই। তারপর আমাদের দলের মতো আরো কয়েকটি দল এখানে আসে। তখন মেজর কাউসার সাহেব সব পার্টিকে চিঠি দিয়ে করণীয় ঠিক করে দিলেন। আমরা ডিউটি ভাগ করে নিলাম। আমাদের টার্গেট ছিলো পুলিশ লাইন্স দখল করা। একদিন আমরা শহরে ফাঁকা গুলি করি। তারপর থেকে রাজাকার বা খান সেনারা আর টহল দিতো না। একদিন দেখি খানসেনারা গান বোট নিয়ে চলে গেলো। আলিকান্দা পুলিশ ক্যাম্পে থাকতো রাজাকার আর পলিশ সদস্যরা। পুলিশ লাইন্সের তিন দিক আমরা ঘিরে ফেলে একদিক ফাঁকা রাখি। ভোর ৪টার দিকে আমরা আক্রমণ করে অনেক পুলিশ সদস্যকে মেরে ফেলতে সক্ষম হই। বাকিরা ধরা দেয়। এর মধ্যদিয়ে বরিশাল পুরো হানাদার মুক্ত হয়।
মেজর কউসার সাহেব ওয়ারলেসে খবর পান গোটা বাংলাদেশ মুক্ত হয়ে গেছে। আমরা বরিশালে অস্ত্র জমা দেই । তারপর খুলনা হয়ে বাড়ি ফিরে আসি। পরবর্তীতে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেই।

Leave a Reply