রণাঙ্গনের গল্প: বালিয়াদাহে সম্মুখ যুদ্ধে রাজাকাররা পিছু হটে
সৌমেন মজুমদার, তালা: বীর মুক্তিযোদ্ধা ময়নুল ইসলাম। তখন বয়স ২৩ বছর। বাগেরহাট পিসি কলেজ ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন তিনি। রাজনৈতিক কারণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিলো তার। দেশকে স্বাধীন করার স্বপ্ন দেখতেন সবসময়। কিন্তু এ জন্য যে যুদ্ধে নামতে হবে সেটা ছিলো অনুমানের বাইরে। তাই শুধুমাত্র দেশ মাতৃকার টানেই অংশ নেন মহান মুক্তিযুদ্ধে।
দৈনিক সুপ্রভাত সাতক্ষীরাকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ৩ মার্চ থেকে যখন দেশের সার্বিক পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকে, রাস্তাঘাট আস্তে আস্তে বন্ধ হতে থাকে ঠিক তখনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণ দেশ জুড়ে আড়োলন সৃষ্টি করে। তখনও যশোর অঞ্চলে পাক আর্মি ক্যান্টনমেন্টের মধ্যেই অবস্থান করছিলো। বাবা চাকরি করতেন রেল বিভাগে। আর সে কারণেই চেংগুটিয়া স্টেশন কোয়াটারে পরিবারের সাথে থাকতাম। নওয়াপাড়ার এমপির ডাকে সাড়া দিয়ে আমরা একত্রিত হই। সেখান থেকে পরিকল্পনা হয় রেল লাইনের স্লিপার খুলে ফেলার। সেই অনুযায়ী এক কালভার্টের পাশ থেকে স্লিপার সরিয়ে ফেলি। যেন ট্রেন পার হতে না পারে। এই খবর শুনে যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে একদল আর্মি নওয়াপাড়া স্টেশনে গিয়ে সেখানে যারা ছিলেন তাদের ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে। কিন্তু পরে দেখা যায় স্টেশন মাস্টার বেঁচে আছেন। এরপর ২-৩ দিন যশোর-খুলনা রোড খোলা ছিল। এই ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পুরুষ মহিলারা দল বেধে আসে যশোর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করতে। আমিও ছিলাম। সাধারণ জনগণ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে খাবার, ডাব, পানি নিয়ে আসে ঘেরাওকারীদের সাহায্য করতে। ৪-৫ দিন ধরে একটানা ঘেরাও করে রাখলেও আর্মি প্রথমে কোন বাধা দেয়নি। তারপর আর্মি একটু একটু করে অগ্রসর হয়। আমি বাবার কথা মত গ্রামের বাড়ি চলে আসি। পরে আমিসহ আরও ৮ জন একত্রিত হয় মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য। কিন্তু ট্রেনিং ছাড়া অস্ত্র পাবো না- সেটা খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছিলাম। অনেক খোঁজখবর নিয়ে ভারতে ট্রেনিংয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি মাগুরার শেখ শামসুর রহমান, ধুলন্ডার হাবিবুর রহমান, বারুইপাড়ার নির্মল কুমার পাল, মাগুরার শেখ আব্দুল মান্নান, আমার দুই মামাতো ভাই শরিফুল ইসলাম, মকবুল ইসলাম, বালিয়াদাহর আব্দুর রাজ্জাকসহ ৯ জন ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও শেষ পর্যন্ত ৪ জন আমাদের সাথে আর যায়নি। বাড়িতে কাউকে কিছু না বলে মায়ের উদ্দেশ্যে একটা চিঠি লিখে (যুদ্ধে যাচ্ছি, বেচে থাকলে ফিরে আসবো) রাস্তা থেকে একজনের হাতে দিয়ে আমরা ৫ জন একটা স্কুটার রিজার্ভ করে যাচ্ছিলাম বর্ডার এর উদ্দেশ্যে। প্রথমে আমাদেরকে পাটকেলঘাটা ওভার ব্রিজের উপর দুই জন বয়স্ক বাংলাদেশি পুলিশ আটকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেন। আমরা প্লান করেছিলাম কেউ কিছু জানতে চাইলে বলবো আমার জন্য মেয়ে দেখতে যাচ্ছি। তারপর নগরঘাটা পৌঁছালে সেখানকার চেয়ারম্যান আব্দুল বারী আমাদের আবার আটকে দেন এবং বিনেরপোতা রাজাকার ক্যাম্প এ খবর দেন। যিনি গিয়েছিলেন উনি প্রায় ২-৩ ঘণ্টা পরে এসে বলেন, আজ তারা আসতে পারবে না। কারণ আর্মিদের বড় অফিসার এসেছে ক্যাম্পে। তারপর আমাদের ছেড়ে দেয়। পরে জানতে পারি সেই লোকটা আসলে রাজাকার ক্যাম্পে যায়নি, আমাদের বাঁচানোর জন্য। এরপর আমরা ঝাউডাঙ্গার পাচরকি হয়ে ভারতে ঢুকি। ভারতে ডোকার পর আমরা ৫ জন বিভিন্ন পরিচিত মানুষের বাড়ি গিয়ে উঠি। পরদিন বশিরহাট দেখা করবো- এই পরিকল্পনা রেখে। এরপর কামরুজ্জামান টুকুর সাথে দেখা করি। উনি আমাকে আর শরিফুলকে ট্রেনিং এ যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। মুজিব বাহিনীর ট্রেনিংয়ে যোগদানের জন্য আমরা মানসিক প্রস্তুতি নিলাম। বশিরহাট থেকে বাসে উঠে বারাসাত। সেখান থেকে ট্রামে উঠে হাওড়া স্টেশন। হাওড়া থেকে প্রায় ১৫০ জন রাত সাড়ে ১০টায় গোহাটি এক্সপ্রেসে। সেদিন প্রথম ইঞ্জিনিয়র মুজিবর রহমান ভাইকে দেখি। কিন্তু উনি আমাদের সাথে ট্রেনে ওঠেননি। পরদিন সকাল ১১টার দিকে বিহারের একটা স্টেশনে নামি। সেখান থেকে ট্রেনে শিলিগুড়ি, শিলিগুড়ির বাগডোরা এয়ারপোর্ট থেকে কার্গো বিমানে করে যায় দেরাদুনের ইন্ডিয়ান রয়াল আর্মিদের ট্রেনিং ক্যাম্পে।
আমাদের ট্রেনিংও শুরু হয় খুব দ্রুত। ক্যাম্পটা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৬৫০০ ফুট উপরে ছিলো। প্রায় ১ মাস ট্রেনিং শেষে ফিরে আসি নিউ ব্যারাকপুরের গান্ধিঘাট। সেখান থেকে পাচরকি হয়ে বাংলাদেশে ঢুকি। পরদিন আসি নগরঘাটায়। ইঞ্জিনিয়র মুজিবর রহমানের নেতৃত্বে আমরা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। আমার অস্ত্র ছিলো এসএলআর। পরদিন ভোরে মাদরা এসে বাতুয়াডাঙ্গা মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে যায়। প্রথম সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি বালিয়াদাহ রাজাকারদের সাথে। আমরা ২৯ জন এক সাথে রাজাকারদের উপর আক্রমণ শুরু করি। এক পর্যায়ে রাজাকাররা পালিয়ে যায়। এরপর প্রায় ১০ দিন পর আর্মিসহ রাজাকাররা আমাদের উপর ত্রিমুখি আক্রমণ করে। আমরাও পাঁচটি টিমে ভাগ হয়ে প্রস্তুত থাকি ওদের জন্য। কারণ আমরা আগের থেকে খবর পেয়েছিলাম। শুরু হয় সম্মুখ যুদ্ধ। আমি আমার টিম নিয়ে বললামপুরে অবস্থান করি। চতুর্দিক থেকে উভয়পক্ষের গোলাগুলির এক পর্যায়ে রাজাকাররা পিছু হটে যায়। এরপর কপিলমুনির রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণে অংশগ্রহণ করি। নিজস্ব টিম নিয়ে কপিলমুনি রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণে করি। অন্য দিকে আরও অনেক টিম ছিলো, যার যার অবস্থানে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কপিলমুনি রাজাকার ক্যা¤পকে রাজাকার মুক্ত করি। রাজাকারদের গুলিতে আমাদের কোন ক্ষতি না হলেও আরসিএল এর গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে আমাদের পেছনে এসে পড়ে। প্রাণে বেঁচে যায় আমরা। তারপর বিজয়ের নিশানা উড়িয়ে খলিশখালিতে ক্যাম্প কমান্ডার হিসাবে অবস্থান গ্রহণ করি। অপেক্ষা করি বঙ্গবন্ধুর দেশে ফেরার। পরে ঢাকায় গিয়ে স্টেডিয়ামে অস্ত্র জমা দেই।

Leave a Reply