রণাঙ্গনের গল্প: গঙ্গারামপুরের কালভার্ট উড়িয়ে দেই
এসএম নাহিদ হাসান: বীর মুক্তিযোদ্ধা এমাদুল পাড়। বাড়ি তালা উপজেলার জেয়ালা নলতা গ্রামে। ১৯৭১ সালে এমাদুল পাড় ২২ বছরের তরতাজা যুবক ছিলেন। টগবগে এই তরুণ কখনো অন্যায়ের সাথে আপোস করতেন না। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ তার মনে দাগ কেটেছিল। তিনি ভাবতে শুরু করেন যেভাবেই হোক বাংলাদেশের স্বাধীনতা আনতে হবে। এই ব্রত নিয়েই অংশ নেন মহান মুক্তিযুদ্ধে।
মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরে তিনি দৈনিক সুপ্রভাত সাতক্ষীরাকে বলেন, ২৫ মার্চ কালো রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালি নিধনে গণহত্যা শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় ধীরে ধীরে পাকিস্তানিদের নির্যাতন শহর ছাড়িয়ে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। আমার বাড়ি থেকে মাত্র ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে চুকনগর এলাকায় শুরু হয় পাকিস্তানিদের চরম নির্মমতা। দিনে দুপুরে রাজাকার আলবদররা পাকিস্তানিদের হাতে এদেশের মা বোনদের তুলে দিতো। আমাদের আসে পাশের গ্রামের হিন্দুবাড়ি থেকে অল্প বয়েসি মেয়েদের তুলে নিয়ে যেতো। বাড়ি লুট করতো স্থানীয় রাজাকাররা। এসব খবর শুনে তার মন বিচলিত হয়ে ওঠে। তিনি তার বন্ধু আলাউদ্দিন জোয়ার্দার, হোসেন আলী গাজী, আশরাফ উদ্দিন মোড়ল, রবীন, আব্দুল হাইসহ আরও কয়েকজন বন্ধুর সাথে এসব বিষয় নিয়ে নিয়মিত আলেচনা করতেন। এর মধ্যে বাঙালিরা বিভিন্ন জায়গায় পাকিস্তানিদের প্রতিহত করতে শুরু করে। এক পর্যায়ে তারা জানতে পারলেন ভারতে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং চলছে। সকলে সিদ্ধান্ত নিলেন গোপনে যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে ভারত যাবেন। যে কথা সেই কাজ। তারা গোপনে বাংলাদেশের সীমান্ত পেরিয়ে চলে যান ভারতের বশিরহাটে। সেখানে তারা আশ্রয় নেন পিপল জমিদার বাড়ি। সেখানে প্রায় দেড় মাস যুদ্ধের প্রাথমিক ট্রেনিং দেওয়া হয় তাদের। সেখানে তার দেখা হয় তৎকালিন প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য আলাউদ্দিন সাহেবের সাথে।
তিনি আরও বলেন, ট্রেনিং শেষে কোন অস্ত্র পাওয়া গেলো না। কিন্তু তারা জানতেন যে পাকিস্তানিদের সাথে যুদ্ধ করতে হলে অস্ত্রের কোন বিকল্প নেই। তাই তারা সেখান থেকে অস্ত্রের ট্রেনিং নিতে চলে যান ৫-৭শ মাইল দূরে, বিহারে। সেখানে বিহারের চাকুলিয়া ক্যাম্পে সিক্স উইন্স/নাইন সেক্টরে মেজর মঞ্জুরের তত্ত্বাবধানে আমরা ভারী অস্ত্র চালানো ও সকল প্রকার যুদ্ধের কৌশল রপ্ত করি। ছুন্নু মিয়া নামে এক জন আমাদের ট্রেনিং দেয়। একমাস আমাদের কঠিন ট্রেনিং দেওয়া হয়। প্রায় প্রতিদিন ট্রেনিং শেষে বড় পর্দায় দেশের যুদ্ধের ছবি ও গান শুনানো হতো। ওই সময় এক খান সেনাকে ধরে আটকে রাখা হয়েছিলো। আমাদের ওই খানকে দেখানো হতো। ট্রেনিং শেষে আমরা আবার পিপল জমিদার বাড়ি ফিরে আসি। তারপর আমাদের অস্ত্র দেওয়া হয়। আমাকে থ্রি নট থ্রি রাইফেল দেওয়া হয়েছিল। বন্ধু আব্দুল হাইয়ের কাছে মার্ক ফোর বন্দুক দেয়া হয়। হোসেন গাজীকে এসএলআর দেওয়া হয়। আমরা প্রথম সম্মুখ যুদ্ধ করি হাওয়ালখালি সীমান্তে। আমাদের গ্রুপে ছিলো ৩৫ জনসহ প্রায় দুই শতাধিক যোদ্ধা। এ যুদ্ধে অনেক পাকিস্তানি সেনা মারা যায়। আর আমাদের এক সাথীও শহীদ হয়েছিল। আমরা অবস্থান করছিলাম হাওয়ালখালি গ্রামে। মাঝখানে ছিলো একটি বড় বিল। বিলের ওপারে পাকিস্তানিদের অবস্থান ছিলো। বর্ষার সময় ছিলো তখন। একদিকে বর্ষা অন্যদিকে পাকিস্তানিরা বর্ষার মতো গুলি ছোড়ে। আমরা তখন পাট খেত থেকে গুলি ছুড়ে প্রতিহত করার চেষ্টা করছি। এসময় কয়েকটা গুলি আমার কানের পাশ ঘেষে চলে যায়। তবে গুলির গতি না থাকায় বেঁচে যায়। আমাদের সাথে থাকা অন্য গ্রুপের একটি ছেলের কাছে এলএমজি ছিলো। সে একা গুলি করতে করতে বিলের ভিতর চলে যায়। একটানা অনেক সময় ধরে ব্রাশফায়ার করতে থাকে। তার গুলিতে অনেক পাকিস্তানি হানাদার মারা যায়। সে এক রাত এক দিন বিলের ভিতর ছিলো, পরে মারা যায়। হাওয়ালখালির যুদ্ধ শেষে আমরা চলে আসি বাংলাদেশে। তারপর গোপনে আমাদের এলাকায় ছোট ছোট অপারেশন করি। কারণ আমরা ছিলাম গেরিলা যোদ্ধা। বিভিন্ন রাজাকারের ঘাটি থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করি। প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা আলাউদ্দিন ভাইয়ের নির্দেশে আমরা ২-৩ জন খলিলনগরের একটি রাজাকারের বাড়ি থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করি। সেখানে একটা বিপত্তি ঘটে। ওখানকার একটি রাইফেলে গুলি লোড করা ছিলো। অসাবধানতাবশত ফায়ার হয়। কপাল ভাল থাকায় বেঁচে যায়।
পরে তালার শেষ সীমান্ত গঙ্গারামপুর গ্রামে অবস্থান নেই। তখনকার সময় গঙ্গারামপুরে একটি ভাল বড় কালভার্ট ছিলো। পাকিস্তানিরা যেন কপিলমুনি যেতে না পারে সেজন্য একরাতে আমি আশরাফ মাহমুদসহ মাগুরার কয়েকজন মিলে স্টোলজি ফিট করে ঐ কালভার্টটা উড়িয়ে দিয়েছিলাম। পরে কপিলমুনিতে বড় ধরণের যুদ্ধ হয়। ডিসেম্বরের ৮-৯ তারিখ পর্যন্ত কপিলমুনিতে যুদ্ধ হয়। এভাবে অসংখ্য খ- খ- যুদ্ধের মধ্যদিয়ে এক সময় যুদ্ধ শেষ হয়, অর্জিত হয় স্বাধীনতা তথা বিজয়।
পরে আমরা সাতক্ষীরার রাজার বাগান ক্যাম্পে ক্যাপ্টেন শফিউল্লাহর কাছে অস্ত্র জমা দেই।

Leave a Reply