রণাঙ্গনের গল্প: বাড়িতে খবর যায় আমি মারা গেছি
গাজী আসাদ: বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুল খালেক। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ১০নং আগরদাঁড়ী ইউনিয়নের কাশেমপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল খালেক তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সিগন্যাল কোরে কর্মরত ছিলেন। পাকিস্তানের লাহোরে পোস্টিং ছিলো তার। তিন মাসের ছুটিতে এসেছিলেন দেশে। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ ছুটি শেষে ঢাকা সেনানিবাসে যোগদান করেন। তারা কয়েকজন মিলে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনেছিলেন। ভাষণ শুনে আর স্থির থাকতে পারেননি। দেশের জন্য যুদ্ধ করার তীব্র আগ্রহ জন্মে তার মনে। তখনই তিনি ভেবেছিলেন আর হয়তো সেনাবাহিনীতে চাকুরী করা হবে না। চাকুরিস্থল লাহোরে যাওয়ার ট্রানজিটের অপেক্ষায় ছিলেন সেনানিবাসে। আর তখনই ২৫ মার্চ কালো রাতে নির্মমতা প্রত্যক্ষ করেন তিনি। নিজেকে সামাল দিতে কষ্ট হয়েছিল তার। ২৮ মার্চ বিমানে লাহোরে যাওয়ার কথা। কিন্তু যে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ভাষণ শুনেছে সে কিভাবে দেশ ত্যাগ করবে?
২৮ মার্চ আব্দুল খালেক নিজে এবং শ্যামনগরের মমতাজ আলী, হাড়দ্দাহ গ্রামের হরিস, হাদিয়ালী গ্রামের খালেক সেনানিবাস থেকে বেরিয়ে আসেন। প্রায় ৮-৯ দিন পায়ে হেঁটে সাতক্ষীরা পৌঁছান তারা। সাতক্ষীরা ফিরে দেখেন মুক্তি পাগল জনতার সংগ্রাম। এর কয়েক দিন পর এপ্রিলের ১৬-১৭ তারিখের দিকে হাকিমপুর বর্ডার দিয়ে ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগনার মুক্তি ক্যাম্পে ইপিআর কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার তুবারেক উল্লাহ ও হাকিমপুর ৮নং সেক্টরের ই-কোম্পানি কমান্ডার ক্যাপ্টেন শফিউল্লাহ’র নেতৃত্বে রেগুলার ফোর্সে যোগদান করেন। তৎকালীন সেক্টর হেড কোয়াটার কলকাতার কল্যাণীতে রিপোর্ট করার পর যোগদান করেন ১১নং সেক্টরে ভারতের মেঘালয়ে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুল খালেক মুক্তিযুদ্ধকালীন বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরে সুপ্রভাত সাতক্ষীরাকে বলেন, ভারতের মেঘালয়ে যাওয়ার পর ১১নং সেক্টর কমান্ডার কর্নেল তাহেরের অধীনে লে. আসাদুজ্জামানসহ আমরা কয়েকজনের একটা কোম্পানি ঢালু পাহাড়ের পাদদেশে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রংপুর জেলার রৌমারী বিওপি সংলগ্ন ডিফেন্সে অবস্থান করি এবং সেখান থেকে উলিপুর, চিলমারী, কোদালকাটি, রাজেরপুর, হাতিবান্দা, তুলাবান্দা, মালরহাটসহ বিভিন্ন জায়গায় অপারেশন শুরু করি। একদিন গাইবান্ধা জেলার ফলিয়ার রসুলপুরে পাকবাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধ হয়। দীর্ঘ ১৪ ঘণ্টা তাদের সাথে যুদ্ধ করি। তখন আমাদের প্রতিরোধের মুখে ১৬ জন পাক বাহিনীর সদস্য আত্মসমর্পণ করে। এতে আমাদের বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা হতাহত হয়। ওই দিন আমাদের কোম্পানি কমান্ডারের নেতৃত্বে সুবেদার আলতাব, সুবেদার করম আলী, লে. আসাদুজ্জমান এবং আমি আত্মসমর্পণ করা ১৬ জন পাক সদস্যকে ভারতে নিয়ে যায় এবং সেখানে ডুগরা রেজিমেন্টের কাছে হস্তান্তর করে আবার ক্যাম্পে ফিরে আসি। আমার যুদ্ধকালীন অনেকগুলো বেদনাদায়ক স্মৃতি আছে। তার মধ্যে কামালপুরের যুদ্ধে আমাদের কমান্ডার কর্নেল তাহেরের গায়ে সেল লাগে এবং তিনি মারাত্মক আহত হন। এই ঘটনাটা এখনো আমাকে কষ্ট দেয়। এছাড়া যুদ্ধকালীন সময়ে অনেক সহযোদ্ধাকে হারিয়েছি সেটা অনেক কষ্টের। সর্ব শেষ আমরা গাইবান্ধা জেলাকে শুত্রু মুক্ত করি এবং ১৬ ডিসেম্বর গাইবান্ধার কোর্ট চত্বরে স্বাধীন দেশের বিজয়ী পতাকা উত্তোলন করি। এরপর ঢাকার পিলখানায় নিজ কর্মস্থলে রেগুলার কোরে যোগদান করি এবং ১৯৭৫ সালে চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণ করি।
তিনি স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে আরো বলেন, যুদ্ধকালীন সময়ে আমার বাড়ির কারো সাথে কোন যোগাযোগ ছিলো না। হঠাৎ একদিন আমার বাড়িতে খবর আসে আমি মারা গেছি। তখন আমার বাবা আমার ছবি নিয়ে বিভিন্ন ক্যাম্পে খুজতে লাগেন। একদিন আমার এক বন্ধু আনোয়ারকে আমার ছবি দেখানোর পর সে চিনতে পারে এবং বাবাকে পিলখানায় পাঠিয়ে দেয়। সেখানে বাবার সাথে দীর্ঘদিন পর দেখা হয় এবং বাবার সাথে নিজ গ্রামে ফিরি।
কেমন বাংলাদেশ দেখতে চান প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। বড় আশা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের জন্য যুদ্ধ করেছিলাম। আজ বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ অনেক এগিয়েছে। আমার শেষ ইচ্ছা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ বাস্তবায়ন হোক। এবং আমি আশা করি দ্রুত সেটা হবে।
তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে তিনি আহ্বান জানান, তোমরা দেশের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানো এবং সেই ইতিহাস অনুযায়ী সোনার বাংলা গড়ার কাজে অবদান রাখো।

Leave a Reply