মীর খায়রুল আলম : বাংলাদেশর মুক্তিযুদ্ধের ৯নং সেক্টরের প্রতিষ্ঠাতা সাব-সেক্টর কমান্ডার কমান্ডার ক্যাপ্টেন শাহজাহান মাস্টারের ২৯তম মৃত্যু বার্ষিকী শনিবার । এ উপলক্ষে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছন ক্যাপ্টেন শাহজাহান মাস্টার স্মৃতি সংরক্ষণ কমিটি। ক্যাপ্টেন শাহজাহান মাস্টার ১৯৩৭ সালের ৬ ফেব্রæয়ারী টাউন শ্রীপুরের বিখ্যাত মিস্ত্রি বংশে জন্মগ্রহন করেন। তৎকালীন বৃটিশ শাসন আমলে সাত জমিদারের বসতি ও বাংলাদেশের প্রথম পৌরসভা টাউন শ্রীপুর গ্রামের মুন্সী খিজির মিস্ত্রির পুত্র। ১৩ ভাই-বোনের মধ্যে একমাত্র তিনিই বেঁচে ছিলেন। তার পিতা অত্যান্ত সহজ-সরল প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। ধর্ম পরায়ন ব্যক্তি হিসাবে এলাকায় বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। হিন্দু জমিদার শাসিত টাউনশ্রীপুর প্রাইমারী স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর টাউনশ্রীপুর শরৎচ্চন্দ্র হাই স্কুলে ভর্তি হন। তিনি নবম শ্রেণীর ছাত্র থাকা অবস্থায় মাতৃভাষা রক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা আন্দোলন শুরু হয়।
তিনি তাদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভাষার প্রতি সম্মান জানিয়ে নিজ বিদ্যালয়ে ৪০ জন ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা করেন। সেখানে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দেওয়ার পর তিনি সকলের নজর কাড়েন। ১৯৫৪ সালে তিনি উক্ত বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাশ করেন। পরে সাতক্ষীরা মহাকুমার একমাত্র কলেজে আইকম ক্লাসে শাহজাহান মাস্টার ভর্তি হন। ১৯৫৬ সালে তিনি আই.কম পাশ করেন। পরবর্তীতে ১৯৫৮ সালে কুষ্টিয়া ডিগ্রী কলেজ থেকে বি.কম পাশ করেন। একই বছরে সাতক্ষীরা পদ্মশাখরা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন। পরে ১৯৫৯ সালে শ্যামনগর থানার ভেটখালী হাইস্কুলে একই পদে যোগদান করেন। সাথে সাথে ১৯৬২ সালে রাজশাহী টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড পাশ করেন এবং শিক্ষা জীবন সমাপ্ত করেন। পরবর্তীতে টাউনশ্রীপুর ও সখিপুর হাইস্কুলের দায়িত্ব গ্রহন করেন। পদ্মশাখরা স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব কালীন সময়ে হাড়োদ্দাহ নিবাসী মোঃ আজিজুর রহমানের কন্যা রাবেয়া খাতুন কে বিবাহ করেন।
১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে দেশ প্রেমে উদ্ভুদ্ধ হয়ে পাকিস্তানী মিলিটারী পরিচালিত মুজাহীদ বাহিনীতে যোগদান করেন। তার দক্ষতার ফলে পাকিস্তান সরকার তাকে সাতক্ষীরা মহাকুমা মুজাহীদ বাহিনীর দায়িত্ব দেন। পরবর্তীতে পাকিস্তান সরকার তাকে ক্যাপ্টেন উপাধীতে ভূষিত করেন। একারনেই তিনি ক্যাপ্টেন শাহজাহান মাস্টার নামে পরিচিত হন। ১৯৭১ সালে ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে দেশ রক্ষার্থে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। তিনি স্থানীয় যুবকদের নিয়ে নিজ এলাকায় মুক্তি বাহিনী গঠন করেন। দেবহাটা থানায় পাকিস্তানী পতাকা নামিয়ে জয় বাংলা পতাকা উত্তোলনের নির্দেশ দেন। বিওপির ৬ জন পাকিস্তানী ইপিআরদের বন্দী করে তাদের কাছ থেকে চায়না রাইফেল ছিনিয়ে নেন। যুদ্ধ কালীন সময়ে ৯ নম্বর সেক্টরের মুক্তি বাহিনীর ট্রেনিং ক্যাম্প টাউশ্রীপুর হাইস্কুলে স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে কৗাপ্টেন শাহজাহান মাস্টার ভরতের টাকীতে মুক্তি বাহিনীর প্রথম ক্যাম্প স্থাপন করেন। যেটি শেষ পর্যন্ত নয় নম্বর সেক্টরের মর্যাদা পায়। একারনে তাকে নয় নম্বর সেক্টরের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। দীর্ঘ ৯ মাসে যুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলার নিজ এলাকায় ফিরে এসে পুনরায় শিক্ষাকতায় যোগদেন। তিনি ইংরেজী ১৯৮৫ সালে তৎকালনি রাষ্ট্রপতি হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদের শাসনামলে বাংলাদেশে প্রথম উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং তিনি দেবহাটার প্রথম উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৯০ সালে তিনি নিজের শর রের মূল্যবান অংশ দুইটি চক্ষু রেজিষ্ট্রীর মাধ্যমে আই ব্যাংকে দান করেন। ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই সখিপুর হাই স্কুলে ক্লাস নেওয়ার সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন।
সাথে সাথে তাকে সখিপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। এরপর ২২ জুলাই দুপুর ১২.৩০ মিনিটে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। ২৪ জুলাই টাউনশ্রীপুর হাইস্কুল প্রাঙ্গনে বিকাল ৫টায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়। তারই স্মরণে প্রতিবছরের ন্যায় এবারও নিজ মাজার সংলগ্ন যথাযত ভাবে পালন করতে ক্যাপ্টেন শাজাহান মাষ্টার স্মৃতি সংসদের পক্ষ থেকে সকল প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে। টাউন শ্রীপুর শরৎচ্চন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অবস্থিত তার মাজার চত্তরে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে পবিত্র কোরআন থেকে তেলওয়াত, শনিবার ২৩ জুলাই সকাল ১০.৩০ মিনিটে আলোচনা সভা, দুপুর ১টা কবর জিয়ারত এবং দুপুর ২টায় তাবারক বিতারন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। স্মরণ সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন জেলা পরিষদ প্রশাসক ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম।
