মীর খায়রুল আলম : দেবহাটায় প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে থাকা এক জনের থেকে আরো ২৩ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছে বলে ধারনা করা হচ্ছে। এতে প্রশাসনের ব্যর্থতা দাবি করে উপজেলার সর্বত্রই বইছে সমালোচনার ঝড়। সাথে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও স্বাস্থ্য বিভাগকে দায়ী করছেন সাধারণ মানুষ।
তবে সাধারণ মানুষের এসব অভিযোগের বিষয়টি সম্পূর্ণ সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আব্দুল লতিফ। অপর দিকে সরকারি সেল নাম্বারটি বন্ধ রেখে নিজের দায় এড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাজিয়া আফরিন।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, গত পহেলা মে নারায়ণগঞ্জ থেকে ২৪ জন ইট ভাটা শ্রমিক এলাকায় আসলে তাদেরকে বাড়িতে না নিয়ে কেবিএ কলেজে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন এ রাখা হয়। গত ৩ মে দশ জনের নমুনা টেস্টে পাঠানো হয়। এর মধ্যে ৮ জনের নমুনা পাঠানো হয় খুলনার ল্যাবে। কিন্তু ৫ মে তাদের এক জনের পজিটিভ বাকি সবাই নেগেটিভ রিপোর্ট আসে। এরপর ১৪ মে তাদের কোয়ারেন্টাইন শেষ হলে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ২য় বার নমুনা সংগ্রহ করে তাদের বাড়িতে যাওয়ার অনুমতি দেয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও স্বাস্থ্য বিভাগ।
কিন্তু তখনও আক্রান্ত ব্যক্তিসহ বাকিদের ২য় দফায় রিপোর্ট আসেনি। এ সময় তাদের মেয়াদ বাড়িয়ে আরো ৪দিনের কোয়ারেন্টাইনে থাকার কথা বলা হয়। কিন্তু কোয়ারেন্টাইনে থাকা ব্যক্তিরা বাড়িতে ফিরে বাজারে, দোকানপাটে, আত্মীয়তা শুরু করে। প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন শেষ হওয়ার পর তাদের কোন তদারকি না থাকায় খেয়াল খুশি মত বিভিন্ন এলাকা চষে বেড়িয়েছে। গত ১৭ মার্চ বিকালে ২৩ জনের পজিটিভ রিপোর্ট আসে। আর এতে ভয় আর আতঙ্ক নেমে আসে উপজেলাবাসীর মধ্যে। তড়িঘড়ি করে রাত থেকে পরিবারগুলোকে লকডাউনে রাখা হয়।
তবে তার আগে ওইসব আক্রান্ত ব্যক্তিরা কতজন সুস্থ মানুষের সংস্পর্শে এসেছেন তার হিসাব নেই কর্তৃপক্ষের কাছে। তাছাড়া রিপোর্ট আসার আগে বাড়িতে পাঠানোর মত বুদ্ধিহীনতায় হতভম্ব সারা জেলার মানুষ। তবে সচেতন মহল বলছেন নির্বাহী অফিসারের এমন ধরনের ভুল সিদ্ধান্তে উপজেলা অসংখ্য মানুষ আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি তাদের জীবন মরণের ঝুঁকিতে রয়েছে। এমনকি কুলিয়া এলাকায় শাড়ি কাপড়ের দোকান গুলোতে যে পরিমাণ ভিড় জমছে তাতে ঈদের পরে দেবহাটায় মহামারি আকার ধারণ করতে পারে। একই সাথে উপজেলায় ভ্রাম্যমাণ বাজার চালু থাকলেও সবগুলো হাট উন্মুক্ত করা হয়েছে। এতে জনসমাগম বেড়ে চলেছে।
রাস্তাগুলোতে বড় যানবাহন না থাকলেও ব্যক্তিগত ও ছোট যানবাহনের চাপ রয়েছে চোখে পড়ার মত। তাই সমগ্র উপজেলাটি লক করা না গেলে এর প্রভাব ভয়ানক ভাবে বিস্তার করবে বলে মনে করেন সচেতন মহল।
এসব বিষয় নিয়ে সদর ইউপি চেয়ারম্যান আবু বকর গাজী বলেন, ওই ব্যক্তিদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টানে রাখার পর থেকে তাদের সার্বিক খোঁজ খবর নিতে থাকি। ১৪দিন পার হওয়ায় তাদের বাড়িতে পাঠানো হয়। তাদের রিপোর্ট আসা পর্যন্ত অপেক্ষা না করায় এটি চিন্তার কারণ হয়েছে। তবে আমরা প্রশাসনের নির্দেশ মোতাবেক সব রকম কাজ করে যাচ্ছি। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অফিসার ডা. আব্দুল লতিফ জানান, আমরা এ পর্যন্ত ৬৪ জনের নমুনা পরীক্ষা করেছি। এর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে থাকা ব্যক্তিদের ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইন শেষ হলে আইইডিসিআর ও সিভিল সার্জনের পরামর্শে তাদের বাড়িতে পাঠানো হয়। কিন্তু তাদের কারো শরীরে কোন উপসর্গ না থাকায় আমরা বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত।
দেবহাটা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) বিপ্লব কুমার সাহা জানান, করোনা প্রতিরোধে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। মানুষকে ঘরে রাখতে এবং সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যরা রাত দিন কাজ করছে। কিন্তু এক সাথে এত জন ব্যক্তি আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি খুবই চিন্তার বিষয়। আমরা আক্রান্তদের বাড়িতে যেয়ে লকডাউন করেছি। তারা যাতে বাড়িতে অবস্থান করে সে বিষয়েও নজর রাখা হচ্ছে। এই মুহ‚র্তে সকলের সচেতনতার বিকল্প নেই। তাই সবাই বাড়িতে থাকুন, পরিবারকে নিরাপদ রাখুন।
এদিকে, উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাজিয়া আফরিন সরকারি সেল নাম্বারটি বন্ধ রাখায় তার মতামত নেওয়া সম্ভব হয়নি। এছাড়া উপজেলা পরিষদ চত্বর ও ইউএনও’র বাসা সংলগ্ন ৫০ গজের ভিতরে চায়ের দোকান, বিভিন্ন দোকান খোলা থাকায় জনমনে আতঙ্ক কাটছে না। তাই উপজেলা ব্যাপী লকডাউন করে সংক্রমণ রোধ করতে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সচেতন মহল।
এদিকে, এ ঘটনার পর দেবহাটা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় খন্ড আকারে এলাকা ভিত্তিক লকডাউন করে দিতে থাকে এলাকাবাসী। এছাড়া নলতা, তারালি, ভাড়াশিমলা, করনা এক্সপার্ট টিমের ৬০জন বিভিন্ন চেকপোস্টে দায়িত্ব পালন করেন। নলতা ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের লোক এক যোগে দেবহাটা ও কালিগঞ্জ উপজেলার চেকপোস্টে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে।
