জিএম মাসুম বিল্লাহ, মুন্সিগঞ্জ (শ্যামনগর) প্রতিনিধি : সুন্দরবন বিশ্ব মানচিত্রে একটি সুপরিচিত নাম। খুলনা বিভাগের সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলা নিয়ে সুন্দরবনের অবস্থান। এই বিশাল ম্যানগ্রোভ বনে এক সময় রাজত্ব করত বনদস্যুরা। ৩২টি বাহিনী প্রধানসহ সর্বমোট ৩শ’ ২৮ জন বনদস্যু আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন। তারা র্যাবের হাতে তুলে দিয়েছেন মোট ৪শ’ ৬২টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৩৩ হাজার ৫শ’ ৪ রাউন্ড গোলাবারুদ।
বনদস্যুদের আত্মসমর্পণের আগে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানিতে বেজে উঠতো পুরো সুন্দরবন। মাছ, কাঁকড়া, মধু, গোলপাতাসহ সুন্দরবন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজের জন্য বৈধভাবে সুন্দরবনে অনুপ্রবেশকারীদের জিম্মি করে হাতিয়ে নিতেন কোটি কোটি টাকা। বনদস্যুদের হাতে নির্যাতিত হতো অসংখ্য জেলে বাওয়ালি। সুন্দরবনের শুধু জেলেরা নির্যাতিত হতো না, জেলেদের পাশাপাশি বনদস্যুরাও আতঙ্কে থাকতেন অন্য বাহিনীর। এই আতঙ্ক থেকে মুক্তি পেতে চাইতেন সকল বনদস্যু বাহিনী।
সরকার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলে একে একে সব গুলো বাহিনীর তাদের ব্যবহৃত অবৈধ অস্ত্র, গোলাবারুদ সরকারের কাছে জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করেন যার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের ১০ ই নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করেন।
এর ফলে দীর্ঘ ৪০ বছর পর গোটা সুন্দরবন এখন বনদস্যুদের শঙ্কা থেকে রেহাই পেয়েছে। তবে বনদস্যু থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা ব্যক্তিদের খোঁজখবর নিয়ে দেখা যায়, দস্যুতা কালীন সময়ের চেয়ে বর্তমানে সুখে থাকলেও শান্তির ছোয়া লাগেনি তাদের জীবনে।
এসবের কিছুটা বোঝা গেল সুন্দরবনের প্রথম আত্মসমর্পণকারী মাস্টার বাহিনীর প্রধান ‘কাদের মাস্টার’র সাথে কথা বলে। কথার এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘আমি সহ আমার বাহিনীর যতগুলো সদস্য আত্মসমর্পণ করছে বর্তমানে সবাই দিন আনে দিন খায়। কোন রকম ভাবেই ইটের ভাটা ও মানুষের বাড়ি কাজ করে চলছে তাদের সংসার। বর্তমানে করোনা পরিস্থিতিতে পরিবার পরিজন নিয়ে না খেয়ে মরার উপক্রম তাদের। এরপরে যদি আবার মামলায় হাজিরা দিতে হয় তাহলে মরা ভালো’।
তিনি আরও বলেন, ‘মংলার দিগরাজ বাজারে আমার একটি মোটর সাইকেলের দোকান আছে। করোনা পরিস্থিতিতে দোকান বন্ধ থাকায় আমি গ্রামের বাড়ি এসে উঠেছি। তিনটা বাচ্চা নিয়ে আমি এখন অসহায় জীবন যাপন করছি। ঘাড়ের উপরে আছে পাঁচটি মামলা প্রতি মাসে দুই থেকে তিন বার হাজিরা দিতে হয় কোর্টে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো একটি মামলাতে যদি সাজা হয়ে যায় তাহলে আমার পরিবার পথে বসে যাবে’।
মাস্টার বাহিনীর প্রধান কাদের মাস্টার আরও জানান, ‘সরকার থেকে দেয়া অনুদানের পুরোটাই চলে গেছে উকিল, মহুরি, কোর্ট, যাতায়াত খরচের পিছনে। আমাদের কোন কিছু দরকার নেই, যদি আমাদের মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হতো তাহলে আমরা জীবনের মত বেচে যেতাম’।
সুন্দরবনের মুকুল বাহিনীর প্রধান মুকুল বলেন, ‘আত্মসমর্পণ করেছি প্রায় পাঁচ বছর হতে যাচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রæতি ছিল আমাদের মামলাগুলো প্রত্যাহার করে নেবেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত তার কোনো সুরাহা হলো না। ৬টা মামলায় আমাকে প্রতি মাসে কয়েক বার কোর্টে যেতে হয়, দিতে হয় অগনিত টাকা। এজন্য প্রতি মাসেই ঋণে জড়িয়ে যাচ্ছি, নিতে হচ্ছে সুদের টাকা। আত্মসমর্পণ করার পর সরকার থেকে টাকা পেয়েছিলাম এক লক্ষ বিশ হাজার। সেটা কয়েক বার বরিশাল বাগেরহাট কোর্টে হাটতে হাটতে আর পরিবারের ভরণপোষণের পিছনে শেষ হয়ে গেছে’।
অপর এক বাহিনী প্রধান ইদ্রিস আলী বলেন, ‘৫টা মামলা আর পাঁচজন পরিবারের সদস্য নিয়ে বিপাকে পড়ে আছি। ৫ জনের মুখে আহার তুলে না দিলেও ৫টা মামলায় হাজিরা দিতে হয়’। শান্ত বাহিনীর প্রধান শান্ত বলেন, ‘৩টি মামলা নিয়ে বসে আছি। প্রতি মাসে যেতে হয় কোর্টে রোজগারের সম্পূর্ণ টাকা কোর্টের খরচেই চলে যায়। আমার বাড়ির পাশে বাজারে আমার একটি দোকান আছে বর্তমান করোনার কারণে দোকানটি বন্ধ আছে। বাচ্চাদের নিয়ে অসহায় জীবন যাপন করছি। আমার দলের অনেক সদস্য আছে তারা আমার কাছে অভিযোগ করে কিন্তু আমি নিজেই অসহায় তাদের আমি কি বলবো। তাছাড়া আমরা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে কোনো সহযোগিতা পাই না’।
মজনু বাহিনীর একজন সদস্য মিলন পাটোয়ারী জানান, ‘আমরা কারো বাড়িতে কাজ করতে গেলে তারা আমাদের কাজে নেয় না। র্যাব এর মাধ্যমে কিছু সহযোগিতা পেয়েছি তা ছাড়া অন্য কেউ আমাদের সহযোগিতা করেনি। করোনা ভাইরাসের কারণে বর্তমানে কাজ করতে না পেরে খুবই অভাব অনাটনের মধ্যে দিন পার করছি। এ অবস্থায় সরকার যদি আমাদের মামলাগুলো প্রত্যাহার করে নেন তাহলে আমারা না খেয়েও বাড়ি থাকতে পারবো’।
আলম বাহিনীর প্রধান আলম জানান, ‘আত্মসমর্পণের পরে ইজিবাইক কিনে কোন রকম দিনাতিপাত করছিলাম। বর্তমানে করোনা পরিস্থিতিতে যাত্রী পরিবহন নিষেধ থাকায় মানবেতর জীবন যাপন করছি। একদিকে মামলার বোঝা অন্যদিকে সংসারের বোঝা নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছি’।
তারা সাংবাদিকদের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আবেদন জানিয়ে বলেন ‘আপনি তো মানবতার মা, আমাদের মামলাগুলো প্রত্যাহার করে দেন। মামলার বোঝা থেকে আমাদের বাঁচান’। দ্রæততম সময়ের মধ্যে মামলাগুলো নিষ্পত্তি করা হবে এমনটাই আশা করেন বাহিনী প্রধান সহ সকল সদস্যরা।
