জি.এম আজিজুল ইসলাম: রোজ কত মানুষ মারা যায় আর কত মানুষ জন্ম গ্রহণ করে। কে তাদের কথা মনে রাখে? কিন্তু মাঝে মাঝে এমনও মহা মনীষী জন্মগ্রহণ করেন যাদের কথা মানুষ চিরদিন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। এমনই একজন মহান শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি ছিলেন সুলতানুল আউলিয়া কুতুবুল আকতাব আরেফ বিল্লাহ হযরত শাহ সুফী খান আতিয়ূর রহমান (রহ.)। অবিভক্ত ভারতে যে কয়জন মহা মনীষী ইসলাম প্রচার ও প্রসারে নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন তাদের মধ্যে খান আতিয়ূর রহমান (রহ.) ছিলেন একজন। বাংলা ১৩১৬ সালে সাতক্ষীরা সদর উপজেলর ফিংড়ী ইউনিয়নের গোবরদাড়ী জি.ফুলবাড়ী গ্রামে এই মহান মণীষী জম্মগ্রহন করেন। তার পিতার নাম নছিমুদ্দীন খান, মাতা ফাতেমা খাতুন। তিন ভাই আর দুই বোনের মধ্যে খান আতিয়ূর রহমান(রহ.) ছিলেন সবার বড়। পিতার আর্থিক দৈন্যতার কারণে শিশু বয়সে তিনি সাতক্ষীরা সদর উপজেলার পায়রাডাঙ্গা গ্রামে ফুফুর বাড়িতে থেকে লেখা পড়া করেন। এখানে থেকে তিনি স্থানীয় বাবুলিয়া হাইস্কুলে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত এবং পরবর্তীতে ভারতের চব্বিশ পরগনা জেলার হাকিমপুর হাইস্কুল থেকে ম্যাট্টিক পাশ করেন। অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতার কারনে খান আতিয়ূর রহমান (রহ.) এর লেখাপড়া আর বেশিদুর এগুতে পারেনি। এরপর জীবন ও জীবিকা নির্বাহ করতে যোগ দেন পিতার সাথে। পিতার কাপড়ের দোকানে তিনি কাজ করতে থাকেন। এক পর্যায়ে কুল্যা ইউনিয়নে গ্রাম পঞ্চায়েত নির্বাচিত হয়ে সুনামের সাথে কাজ করেন। শৈশব কাল থেকে খান আতিয়ূর রহমান (রহ.) ছিলেন সত্যবাদী, ক্ষমাশীল, ধৈর্যশীল ও কর্তব্যনিষ্ঠ। তার জীবন ধারণ পদ্ধতি ছিল খুবই সাধারণ। এমনিভাবে চলতে থাকে খান আতিয়ূর রহমান (রহ.) এর জীবন। যৌবনের এক পর্যায়ে এসে তিনি নলতা শরীফের সুলতানুল আউলিয়া, কুতুবুল আকতাব, আরেফ বিল্লাহ, গাউছে জামান হযরত শাহ সুফী খান বাহাদুর আহছান উল্যাহ (রহ.) এর সান্নিধ্য লাভ করেন, মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি নলতা শরীফের খতিব পদে অভীষ্ট ছিলেন। খান আতিয়ূর রহমান (রহ.) ছিলেন স্বাধীনতা কামী একজন মহান পুরুষ। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি রাত জেগে ইবাদত করতেন, আর দেশের স্বাধীনতা কামনা করে দোয়া চাইতেন। তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ, মুক্তিযুদ্ধের নয়মাস তিনি রোজাব্রত পালন করেন। তিনি বলতেন, দেশ যতদিন স্বাধীন না হবে ততদিন তিনি রোজাব্রত পালন করবেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে খান আতিয়ূর রহমান (রহ.) প্রচুর ধন সম্পত্তির মালিক হন। কিন্তু এ ধন সম্পত্তি তিনি নিজের কাজে ব্যয় করেন নি। তিনি জি.ফুলবাড়ি হাফিজিয়া মাদরাসা, আলিম মাদরাসা, পোস্ট অফিস, ব্যাংক, মসজিদ আহছানিয়া মিশন, এতিমখানাসহ বহু প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। খান আতিয়ূর রহমান (রহ.) এর জীবনের ব্রত ও শিক্ষা ছিল স্রষ্টার ইবাদত ও সৃষ্টের সেবা। এই অসাম্প্রদায়িক মহান ব্রত দেশ কাল ছাপিয়ে গিয়েছিল। তিনি বনের পশু পাখিকে খুব পছন্দ করতেন। বনের পশুরাও তার অসাধারণ ব্যক্তিত্বকে অলৌকিকভাবে পছন্দ করতো। কথিত আছে, একবার একাধারে পাঁচ বছর তিনি ভারতে পেন্ডারোড হাসপাতালে কাটান। পেন্ডা রোডে থাকাকালীন বহু অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল তার মধ্যে স্মরণীয় ঘটনাটি ঘটে কোন এক রমজান মাসে। তিনি তারাবির নামাজের ইমামতি করতেন। একদিন মসজিদে আসার সময় দুটি বাচ্চসহ একটি বাঘের সাথে দেখা হলে বাঘটি কোন হুংকার বা গর্জন না করেই পথ রোধ করে বসে থাকে। এ সময় অন্যান্য মুসুল্লিরা বিষয়টি দেখে খান আতিয়ূর রহমান (রহ.) কে জানাল। তিনি এসে বাঘটিকে বাচ্চাসহ সরে যেতে বললেন। তিনি আরো বললেন, নামাজের সময় আর কখনো মুসুল্লিদের পথ রোধ করে থাকবে না। বাঘটি তৎক্ষনাৎ বাচ্চা দুটি নিয়ে নতশিরে চলে গেল। এই ঘটনার পর লোকে খান আতায়ূর রহমান (রহ.) কে পীর বলে আখ্যা দেয় এবং তাকে ইসলাম প্রচার প্রসারের কাজে সহযোগিতা করতে থাকে। খান আতিয়ূর রহমান (রহ.) ছিলেন স্বল্পভাষী, অতিথিপরায়ণ এবং মিতব্যয়ী ব্যক্তি। মেহমানদারী করা ছিল তার সবচেয়ে প্রিয় শখ। তিনি মিষ্টান্ন দ্রব্য পছন্দ করতেন। ১৯৭৯ সালের ৫ ফেব্রæয়ারী তিনি ইন্তেকাল করেন। বর্তমানে তার ৯ সন্তানের মধ্যে ৩ কন্যা ও ৬ পুত্র। পুত্রদের মধ্যে প্রায় সবাই দেশে বিদেশে চাকরিরত। প্রতিবছর ইং ৪, ৫ ও ৬ ফেব্রæয়ারী বাংলা- ২২,২৩ ও ২৪ মাঘে জি.ফুলবাড়ি দরগাহ শরীফে ওরছ অনুষ্ঠিত হয়। এ ওরছে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ভক্ত আশেকানরা ছুটে আসেন। খান আতিয়ূর রহমান (রহ.) আজ আমাদের মাঝে নেই কিন্তু তার জীবনাদর্শ ও কীর্তি আমাদের মাঝে আজও স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে আছে।
