মীর খায়রুল আলম: আনন্দ উল্লাসে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যেবর্তী ইছামতি নদীতে স্ব স্ব কিনারায় প্রতিমা বিসর্জন করা হয়েছে। মঙ্গলবার (৮ অক্টোবর) বিজয়া দশমীতে দুর্গা প্রতিমা বিসর্জন উপলক্ষে উভয় দেশের সীমানার গÐির ভিতরেই ছিল মেলার আনুষ্ঠানিকতা। কয়েক বছর ধরে বন্ধ হওয়া মেলাটিতে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পরিণত হত দুই বাংলার মানুষের মিলন মেলায়। সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলাধীন ইছামতি নদীর টাউনশ্রীপুরে এবং ভারতের টাকি পৌরসভা এলাকায় প্রায় ১০ কিলোমিটার জুড়ে চলতো এই মিলন মেলা। এতে দুই বাংলার লাখও মানুষ অংশ নিত। তবে মঙ্গলবার বাংলাদেশ-ভারত দু’দেশের মধ্যে মিলন মেলা দেখতে না পেলেও নিজ নিজ সীমা রেখার মধ্যে অনুষ্ঠিত হয় বিজয়া দশমীর প্রতিমা বিসর্জন মিলন মেলা। দুই বাংলার মিলন মেলার ভেলা ভাসলেও নদীর জিরো পয়েন্টে ডিঙি নৌকায় লাল ফ্লাগ উড়িয়ে দু’দেশের সীমানা নির্ধারণ করতে দেখা যায়। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় ও ঐতিহ্যবাহী প্রতিমা বিসর্জনস্থল দেবহাটার ইছামতি নদী। দেবী দুর্গার প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সর্ব বৃহৎ উৎসব শারদীয় দুর্গা পূজা। এই বিসর্জন কে ঘিরে অনুষ্ঠিত হয় মিলন মেলা। এদিকে বেলা বাড়ার সাথে সাথে দেবহাটার টাউন শ্রীপুর ও ভারতের টাকির দু’পারে জড়ো হতে থাকে লাখো মানুষ। দুপুর থেকে দেবহাটাসহ অন্যান্য সীমান্ত এলাকার বিপুল সংখ্যক দুর্গা প্রতিমাকে বিসর্জনের জন্য নিয়ে আসা হয় সীমান্ত নদীতে। একই সাথে দেবহাটার বিপরীতে ভারতের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার হাসনাবাদ, টাকী ও হিঙ্গলগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার প্রতিমাও নিয়ে আসা হয়। বিগত বছরগুলোতে এই দিনে ইছামতি নদীর তীরে আন্তর্জাতিক সীমারেখাসহ দ্বিধা-দ্ব›দ্ব ভুলে মিলন মেলায় মিলিত হয় প্রতিবেশী দু’দেশের হাজার হাজার মানুষ। কিন্তু কয়েক বছর আইন-শৃঙ্খলা সমুন্নত রাখতে এবং উভয় দেশের মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করে পারাপারসহ সন্ত্রাসী, পলাতক আসামি, দুষ্কৃতিকারীরা যাতে করে অবৈধভাবে এক দেশ থেকে অন্য দেশে না যেতে পারে সেজন্য কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে প্রশাসন। তারই পরিপ্রেক্ষিতে দু’দেশের জাতীয় ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কঠিন সিদ্ধান্তে ঐতিহ্যবাহী এ মিলন মেলা অনুষ্ঠিত হলেও কেউই কোন দেশের স্থলে উঠতে পারেনি। দিনটিতে নিরাপত্তার লক্ষে বাংলাদেশ-ভারতের আন্তর্জাতিক সীমানা নির্ধারণী ইছামতি নদীর বিস্তৃত জিরো পয়েন্ট এলাকা জুড়ে নৌযানে টহল জোরদার করে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) সদস্যরা। তাছাড়া দায়িত্বরত অবস্থায় পর্যাপ্ত সংখ্যক সাদা পোশাকধারী গোয়েন্দা পুলিশ, প্রবেশ পথ সহ সকল সড়কের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিশেষ দায়িত্ব পালন করে। পরে সন্ধ্যার আগ মুহ‚র্তে অশ্রæসিক্ত চোখে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানায় দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের হাজার হাজার মানুষ। সুষ্ঠুভাবে প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন হয়। সাতক্ষীরার দেবহাটা সীমান্তের ইছামতি নদীতে শারদীয় দুর্গোৎসবের বিজয়া দশমীতে দু’বাংলার মিলন মেলার অসংখ্য তরী ভাসে। গত বছরের ন্যায় এবছরও দুপুর থেকে ইছামতি নদীর পাড়ে হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত হয় প্রতিমা বহনকারী নৌকা ও অসংখ্য ভাসমান নৌকা। প্রতিবছর উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের আয়োজনে বাংলাদেশ সীমান্তে ব্যাপক আয়োজন করা হয়। এ বিষয়ে স্থানীয়রা বলেন, দেশ বিভাগের অনেক আগে থেকেই সীমান্তের ইছামতি নদীর উভয় তীরে দুর্গা পূজার শেষ দিন বিজয়া দশমীতে মেলা বসে আসছে। দেশ বিভাগের পরও বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি সীমান্তের সীমারেখা। নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে এ মেলা কখনও বন্ধ হয়নি। সারা বছর ধরে শুধু ইছামতি নদীর পাড়ের মানুষ নয়, বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন এলাকার মানুষ এ দিনটির জন্যে অপেক্ষায়থাকে । বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জন উপলক্ষে ইছামতির উভয় পাড়ে বসে নানা রকমের দোকান। আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ ছাড়াও এখানে আসা মানুষ উভয়ের মধ্যে ভাব বিনিময় শেষে সন্ধ্যার পরে ফিরে যায় যে যার দেশে, যে যার ঘরে। বাঙালী জাতির সর্বজনীন উৎসব শারদীয় দুর্গা পূজা বিজয়া দশমী প্রতিমা বিসর্জন ঐতিহ্য যাতে হারিয়ে না যায় এবং আগামী প্রজন্ম আরও ভালো ভাবে উপভোগ করতে পারে সে জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এদিকে ইছামতিতে আনন্দ উৎসব উপভোগ করতে আসেন জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইলতুৎ মিশ, এডিসি সার্বিক বদিউজ্জামান, এনডিসি সজল মোল্যা, আরডিসি দেওয়ান আকরামুল ইসলাম। এ সময় দেবহাটা উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাজিয়া আফরিন, দেবহাটা থানার ওসি (তদন্ত) উজ্বল মৈত্র, জেলা পরিষদের সদস্য আল ফেরদৌস আলফা, দেবহাটা সদর ইউপি চেয়ারম্যান আবু বকর গাজী, প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসার শফিউল বশার, ইউপি সদস্য সরিফুল মোল্যা, মাহাবুবুর রহমান বাবলু প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। পরে জেলা প্রশাসক ট্রলারে চড়ে ইছামতির সৌন্দর্য উপভোগ করেন। নদীর মধ্যবর্তী স্থানে পৌঁছালে একটি ডিঙি নৌকা জেলা প্রশাসকের ট্রলারে ধাক্কা দিয়ে ডুবে যায়। এ সময় জেলা প্রশাসকের নির্দেশে বিজিবির প্রচেষ্টায় তাদের উদ্ধার করা হয়। তবে এতে কোন ধরনের প্রাণহানি বা কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি। এছাড়া আর কোন অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা না ঘটায় সকলে স্বস্তিতে আনন্দ ভাগ করে সন্ধ্যার পরে সীমান্তবর্তী ইছামতি নদী ত্যাগ করে।
