সমীর রায়, আশাশুনি: চরম জনবল সংকটে আশাশুনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি। পদ থাকলেও নেই পদের বিপরীতে নেই চিকিৎসক ও কর্মচারী। সাড়ে তিন লাখ মানুষের জন্যে চিকিৎসক আছে মাত ৩জন। অ্যাম্বুলেন্সটি বিকল হয়ে পড়ে আছে চার মাস। ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন বন্ধ আইলার পর থেকেই। টেকনিশিয়ানের অভাবে প্যাথলজী সেক্টর বন্ধ, স্টোরকিপার নেই দীর্ঘদিন যাবৎ। ভারপ্রাপ্তের ভারে ভারাক্রান্ত পুরো স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। জরুরী বিভাগে গজ, ব্যান্ডেজ ও তুলা ছাড়া আর কিছু নেই। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. অরুণ কুমার ব্যাণার্জী ও সহকারী সার্জন ডা. সউদ বিন খায়রুল আনাম ও ডা. সাইফুল ইসলাম দেখছেন যাবতীয় রোগী। সরজমিনে হাসপাতালে যেয়ে দেখা গেছে, রোগী ভর্তি রয়েছে ৪২ জন। খাদ্য পেয়েছেন ৩১ জন। বাকি ১১ জনের খাবার বাইরে থেকে নিজ খরচে খেতে হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের অনুমোদন হলেও প্রশাসনিক অনুমোদন না পাওয়ায় কার্যক্রম চলছে ৩১ শয্যারই পুরোনো নিয়মে। জরুরী বিভাগে কর্মরত ছিলেন উপ সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার এনামুল হক। তিনি জানান, এখানে সিল্ক সুতা, ভায়োডিন, স্প্রিড, সুচ, নেই। আছে শুধু গজ, ব্যান্ডেজ ও তুলা। বিদ্যুৎ চলে গেলে আলোর ব্যবস্থা নেই। অক্সিজেনের স্বল্পতা আছে দীর্ঘদিন ধরে। অক্সিজেনের ৬টি সিলিন্ডার থাকলেও দুটি মিটার ভাল আছে। প্রধান সহকারী কাম হিসাব রক্ষক রোকনুজ্জামান চৌধুরী। তিনি আবার অলিখিত স্টোর কিপারের দায়িত্ব প্রাপ্ত আছেন বলে জানান। তার সাথে কথা বলে জানা গেল, হাসপাতালে সার্জারী, মেডিসিন, অ্যানাস্থেসিয়া, গাইনী, শিশু, অর্থ, চর্ম ও যৌন, চক্ষু, ইএনটি, কার্ডিও, টিবি বিভাগে মঞ্জুরিকৃত জুনি. কন্সালটেন্ট পদ থাকলেও সব পদই শূন্য। আরএমও পদটিও শূন্য। ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে আছেন বুধহাটা ইউসিসি’র সহকারী সার্জন ডা. সউদ বিন খায়রুল আনাম। দুই জন মেডিকেল অফিসারের পদ শূন্য। ডেন্টাল সার্জনের পদটিও শূন্য। এমও/হোমিও/ইউনানি/আয়ুর্বেদী (নব) পদে আছেন ডা. সাইফুল আলম। তিনিও প্রেষণে নিয়োজিত আছেন সাতক্ষীরা সদরে। তিনি শুধুমাত্র প্রতি শনিবারে আসেন। সহকারী সার্জন (ইউনিয়ন) ১১টি পদের মধ্যে তিন জন ডাক্তার থাকলেও তারমধ্যে আবার একজন আছেন প্রেষণে সাতক্ষীরা সদরে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রথম শ্রেণি পর্যায়ে খাতা কলমে সর্বমোট মঞ্জুরিকৃত ২১টি পদ থাকলেও কার্যক্রম চালাচ্ছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. অরুণ কুমার ব্যাণার্জী, সহকারী সার্জন ডা. সউদ বিন খায়রুল আনাম ও ডা. সাইফুল ইসলাম। দ্বিতীয় শ্রেণির নার্সিং সুপারভাইজার পদটি শূন্য। সিনিয়র স্টাফ নার্স মঞ্জুরিকৃত পদ ১৫ টি। কর্মস্থলে আছেন ১৩ জন। তার মধ্যে আবার ৩ জন প্রেষণে অন্যত্র গেছেন। স্টাফ নার্সের পদটিও শূন্য। মিডওয়াইফ নার্স চারজন, অনুপস্থিত একজন। দ্বিতীয় শ্রেণির ১৯ পদের বিপরীতে কর্মস্থলে আছেন ১৩ জন। তৃতীয় শ্রেণি পদে প্রধান সহকারী ও হিসাব রক্ষক পদ মঞ্জুর নেই। পরিসংখ্যানবিদ পদটি শূন্য। অফিস সহকারী আব্দুল খালেক অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। অফিস সহকারী কাম মুদ্রাক্ষরিক তিন জনের মধ্যে একজন সাতক্ষীরা টিবি ক্লিনিকে। চিকিৎসা সহকারী দু’জনের পদ শূন্য। ইউনিয়ন চিকিৎসা সহকারী ১১ টি পদে রয়েছে সাত জন। এর মধ্যে অনুপস্থিত একজন ও প্রেষণে একজন। ফার্মাসিস্টের দুটি পদই শূন্য। মেডিকেল টেকনিশিয়ানের দুটি পদ খালি। ডেন্টাল টেকনিশিয়ান নেই। মেডিকেল সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক ১১ টি পদের মধ্যে একজন প্রেষণে সদরে কর্মরত রয়েছেন। ৫৪ জন স্বাস্থ্য সহকারীর মধ্যে ১৪টি পদ শূন্য। সিএইচপি ৩৮ জনের মধ্যে একটি পদ শূন্য। তৃতীয় শ্রেণির ১৪১ টি পদের বিপরীতে কর্মস্থলে আছেন ১০৮ জন এবং ৩৩ টি পদ শূন্য। চতুর্থ শ্রেণির অফিস সহায়ক চার জনের মধ্যে আছেন তিন জন। এর মধ্যে একজন প্রেষণে সিএস অফিসে। ওয়ার্ডবয় তিন জনের একজনও নেই। আয়া ও নিরাপত্তা প্রহরী দুজন করে পদ থাকলেও একজনও নেই। মালী, কুক/মশালচি, ওটিবয়, সুইপার পদের সবাই আছেন। চতুর্থ শ্রেণির ২৪টি পদের বিপরীতে কর্মস্থলে আছেন ১৬ জন। ৮টি পদ শূন্য। গত ২৪ মে থেকে হাসপাতালের একমাত্র অ্যাম্বুলেন্সটি অকার্যকর হয়ে আছে। আজ পর্যন্ত ঠিক হয়নি। মুমূর্ষু রোগীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। ২০০৯ সালে আইলার পর থেকে ডিজিটাল এক্স-রে, ডেন্টাল মেশিন, প্যাথলজী বন্ধ রয়েছে। সম্প্রতি ইসিজি চালু করা হয়েছে। নিয়মিত সিজার ও ছোট খাটো অপারেশন করা হলেও অ্যানেস্থেশিয়ান নেই। হাসপাতালের অনেক ফ্যান ও এসিগুলো নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. অরুণ কুমার ব্যাণার্জী ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান- জনবল ও চিকিৎসক সংকট চলছে। জনবল চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন করেছি তবে এখনও কোন ফল পাইনি। আমরা সাধ্য মত চেষ্টা করে যাচ্ছি। রোগীদের খাবার না পাওয়ার ব্যাপারে বলেন- হাসপাতালটি ৫০ শয্যা বিশিষ্ট অবকাঠামো থাকলেও প্রশাসনিক অনুমোদন না থাকায় ৩১ শয্যা হাসপাতালের নিয়মেই খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে। তবে অতিরিক্ত রোগীদের জন্য বেডের ব্যবস্থা করা হবে। জরুরী বিভাগে চিকিৎসার যে সরঞ্জাম ফুরিয়ে গেছে সেগুলি দ্রæত পূরণের ব্যবস্থা করা হবে। ডেঙ্গু রোগ ও চিকিৎসার ব্যাপারে বলেন- আমাদের এখানে এখনও পর্যন্ত কোন ডেঙ্গু রোগী আসেনি। তবে এলেও পর্যাপ্ত পরিমাণ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
