ফিচার ডেস্ক: উপকূলীয় প্রাণবৈচিত্র্য নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত তাদের জীবন জীবিকার মান উন্নয়নে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করে চলেছে। কখনো পারস্পরিক আলোচনা, কখনো একে অন্যের সমস্যা সমাধানে নিজেদের জ্ঞান দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বিনিময় প্রদান করে চলেছে। আর নিজেদের এ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রাণ বৈচিত্র্য সমৃদ্ধ কৃষি বাড়ি গড়ে তোলার উদ্যোগ নিচ্ছে। আর এসকল কৃষি বাড়ির উন্নয়ন এবং নতুন নতুন কৃষি বাড়ি তৈরি সহ প্রাণ বৈচিত্র্য সংরক্ষণে আগ্রহী ও উদ্যোগী করে তুলতে কৃষি বাড়ি পরিদর্শন ও অভিজ্ঞতা বিনিময় সফরের আয়োজন করা হয়। এ অভিজ্ঞতা বিনিময় সফরের মাধ্যমে তাদের মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতার মনোভাব তৈরি হয়। ঠিক তেমনি বারসিকের ধারাবাহিক কাজের মধ্যে কর্ম এলাকার কৃষক-কৃষাণীদের নিয়ে অল্পনা রানীর কৃষি বাড়ি পরিদর্শন করানো হয়। এসময় অংশগ্রহণকারী কয়েকজন কৃষাণী অল্পনা রানীর কৃষি বাড়ি দেখে তাদের খুবই ভালো লাগে এবং তারা নিজেরা খুবই দ্রæত অল্পনা রানীর মতো কৃষি বাড়ি ও সংগঠন তৈরির কথা ব্যক্ত করেন। ঠিক তেমনি একজন নারী শ্যামনগর উপজেলার কাশিমাড়ি ইউনিয়নের শংকরকাটি গ্রামের কৃষাণী নাজমা বেগম(৪৪)। নাজমা বেগমের সংসারের তেমন কোন অভাব নেই স্বামী আগে বিদেশ থাকতো নিজেদের প্রায় ৫বিঘার মতো জমি যার মধ্যে ২বিঘার মতো ভিটা বাড়ি। তা দিয়ে তাদের খুবই ভালো ভাবে চলে যায় স্বামী, ছেলে মেয়ে ও শুশুর সহ ৫ জনের সংসার। বিগত কয়েক মাস আগে ধুমঘাট গ্রামের অল্পনা রানীর কৃষি বাড়ি পরিদর্শনের পাশাপাশি পাখিমারা গ্রামে বোনের বাড়িতে বেড়াতে যান এবং সেখানে বোনদের তৈরিকৃত পাখি মারা নারী সংগঠন দেখেন। সেখানে বোনের কাছে জানেন যে তারা কীভাবে সংগঠন কোরল এবং সংগঠন করে কি কি কাজ করে কাদের সহায়তায় এ সংগঠন তৈরি হলো। এক পর্যায়ে বোন বলল যে উপজেলা কৃষি অফিসের আইসিএম স্কুল এবং বারসিক নামের একটি এনজিওর সহায়তায় আজ আমরা সংগঠিত হয়েছি। পাখি মারা ও ধুমঘাট গ্রামের নারী সংগঠন ও তাদের উদ্যোগ দেখে উদ্যোগী হয়ে নিজেই একটি সংগঠন ও কৃষি বাড়ি তৈরি চেষ্টা করতে থাকেন নাজমা বেগম। বর্তমানে নাজমা বেগম তার বাড়িটিকে একটি কৃষি বাড়িতে রুপ দিয়েছেন। সেখানে বছর ব্যাপী কিভাবে ফসল ফলানো যায় সেভাবে চেষ্টা করছেন। বর্তমানে তার বাড়িতে ফলজ ও কাঠ জাতীয় উদ্ভিদ নারকেল, খেজুর, তাল, তেতুল, কদবেল, আম,জাম, লেবু, আমড়া, পেয়ারা পেঁপে, সবেদা, কলা, ডালিম, নইল এছাড়া কাঠ জাতীয় শিশুফুল, নিম, আকাশমনি, জিবলী, মেহগনি ও বাঁশ আছে। সবজির মধ্যে ঢেঁড়স, ডাটাশাক, পুঁইশাক, লাউ, মিষ্টি কুমড়া, চালকুমড়া, তুরুল, ঝিঙ্গা, বরবটি, শিম, উচ্ছে, কুশি, শসা, লালশাক, পালং শাক, আলু, চুবড়ি আলু,বেগুন, ওলকপি, মূলা, হলুদ, কচুরমুখী , ওল, মানকচু, জলপান কচু, সোলাকচু ইত্যাদি ফসল চাষাবাদ করেন। পারবর্তী বছরে ফসল চাসাবাদের জন্য তিনি বীজ সংরক্ষণ করেন। পাশাপাশি অচাষকৃত উদ্ভিদ খাদ্য ও ঔষধী হিসাবে পেপুল, ক্ষুদকুড়ি, আমরুল, কলমি, সাদা গাদো, লাল গাদো, বউটুনি, সেঞ্চি, কাটানুটে, আদাবরুন, তেলাকচু, থালারুটি, ঘোড়াসেঞ্চী, ঘুমশাক, ঘেটকুল, নোনা গাদো, গিমেশাক, থানকুনি,কাথাশাক,হেলাঞ্চ, কলমি (লাল সাদা), বাকসা, নিমুখা, কালোবিসারী,পাথরকুচি, হেন্না, ঝাউগাছ, তিতবেগুন, তুলসি, উলু, মিশরিদানা সংরক্ষণে রেখেছেন। পুকুরে আছে রুই, কাতলা, শোল, কৈ, পুটি, চিংড়ি, তেলাপিয়া সহ বিভিন্ন ধরনের স্থানীয় মাছ। একই সাথে পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা পূরণে হাঁস ১৫টি, মুরগি ২৮টি। আর এ মুরগির মধ্যে ২০টি স্থানীয় গলাছেলা মুরগি রেখেছেন। এভাবে তিনি তার বাড়িকে একটি কৃষি বাড়ি তৈরির উদ্যোগ চলমান রেখেছে। কৃষি বাড়ির তৈরির পাশাপাশি গ্রামের ১৭ জন নারীকে সংগঠিত করে “শংকরকাটি কৃষি নারী সংগঠন” নামে একটি নারী সংগঠন তৈরি করেন। সংগঠন তৈরির পর থেকে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা, পাড়া মেলা, সঞ্চয়, সরকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ কার্যক্রম চলমান রেখেছেন। এরকম উদ্যোগ নেওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে নাজমা বেগম বলেন, “বাড়িতে ঘর সংসার দেখাশোনা ছাড়া তেমন কোন কাজ ছিলনা। নিজের সময়টাকে কাজে লাগানো সাথে যদি গ্রামের নারীদের একত্রিত করে সরকারী বেসরকারি বিভিন্ন সেবা পেতে তাদের সহায়তা করি তাহলে নিজের একটি সুনাম তৈরি হবে। সাথে বাড়িতে তৈরি বিভিন্ন ধরনের খাদ্য খেতে পারব সংসারে খাবারের মধ্যে ভিন্নতা আসবে পুষ্টিকর খাবারও পাওয়া যাবে। এজন্য কৃষি বাড়ি তৈরি ও সংগঠন তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করি। আমি যেমন অন্য নারীদের দেখে উদ্বুদ্ধ হয়েছি ঠিক আমাকে দেখে যেন অন্য নারীরা উদ্বুদ্ধ হয়। অন্য নারীরা পারলে আমরা কেন পারব না। এমনটা সব সময় মনে হতো । আর এটা সম্ভব হয়েছে অন্য নারী সংগঠনের কার্যক্রম দেখে।” তিনি আরো বলেন, “আমি যে কাজ করছি এ কাজে আমার পরিবার সবসময় পাশে থেকে সহায়তা করছে। আমার শশুর একজন কৃষক সে বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দেয় এবং কোন উদ্ভিদে কি কি গুনাগুন সে বিষয়ে ধারণা দেয়। এলাকার মানুষ এখন আমার বাড়ি দেখতে আসে এবং অনেক নারী এ কাজে আগ্রহী হচ্ছে। নাজমা বেগম আরো বলেন যে,“বাড়িটিকে আরও বেশি বেশি বৈচিত্র্য ভরে তোলার ইচ্ছা আছে। আমার মতো গ্রামীণ অন্য নারীরাও তাদের বাড়িকে প্রাণ বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ করে তুলতে পারে, নিরাপত্তা দিতে পারে পরিবারের খাদ্য চাহিদার। যদি তাদেরকে সে পথে চালিত করা যায়।” উপকূলীয় এলাকায় কৃষি প্রাণ বৈচিত্র্য সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থায়িত্বশীল জীবনযাত্রা পরিচালনার একটি বাস্তব উদাহরণ হলো নাজমা বেগম। নাজমা বেগমের মতো গ্রামীণ নারীর এই জ্ঞান-দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন করা হলে গ্রামের প্রতিটি বাড়ি হয়ে উঠবে বৈচিত্র্যময় প্রাণের সম্ভার যা খাদ্যনিরাপত্তার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ন।
