ডেস্ক রিপোর্ট: সাতক্ষীরা শহরতলীর থানাঘাটায় রোহিঙ্গা সন্দেহে সদর উপজেলার কুশখালীর শিউলি সরকার (৩৭) নামে এক মহিলাকে বেধড়ক মারপিট করে এলাকাবাসী। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ শিউলি সরকারকে উদ্ধার করে বিকেল ৪টার দিকে থানায় নিয়ে আসে। আর সন্ধ্যায় এই খবর পেয়ে শিউলি সরকারের স্বামী শ্যামল সরকার ও মেয়ে পুজা সরকার তাকে থানা থেকে উদ্ধার করে বাড়ি নিয়ে যান।
স্বামী শ্যামল সরকারের দাবি, তার স্ত্রী মাঝেমধ্যে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে।
ঠিক একইভাবে শনিবার কালিগঞ্জের কুশুলিয়া থেকে আটক করা হয় মফিজুল ইসলাম (২৫) নামে এক ব্যক্তিকে। পরবর্তীতে কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের উত্তর রঘুনাথপুর গ্রামের রফিকুল ইসলাম আটক মফিজুল ইসলামকে নিজের ছেলে হিসেবে দাবি করে থানা থেকে বাড়ি নিয়ে যান। তারও দাবি, তার ছেলে মানসিক ভারসাম্যহীন।
অন্যদিকে, শুক্রবার রাতে শহরের বাকাল থেকে রিয়াজউদ্দিন মোড়ল নামে এক মোটরসাইকেল চালককে রোহিঙ্গা সন্দেহে আটক করে মারপিট করে এলাকাবাসী। পরে জানা যায় তার বাড়ি দেবহাটায়। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতার ভাইপো সে।
এভাবেই জেলাব্যাপী ‘ছেলে ধরা রোহিঙ্গা’ গুজবে বিভ্রান্ত হয়ে মানসিক ভারসাম্যহীন প্রতিবন্ধী অথবা সাধারণ মানুষকে আটক করে মারপিটের ঘটনা ঘটছে।
পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে প্রথমেই গুজব বলে নিশ্চিত করা হলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকের কারণে তা ছাপিয়ে গুজব ছড়াতেই থাকে।
ফলশ্রুতিতে শনিবারই গুজবে বিভ্রান্ত হয়ে সাতক্ষীরা শহরতলীর থানাঘাটা থেকে একজন, কালিগঞ্জে সাতজন, শ্যামনগরের রমজাননগরে তিনজন ও নওয়াবেকিতে দুইজনকে আটক করে স্থানীয় জনতা।
এ ব্যাপারে অধিকতর অনুসন্ধানের জন্য দৈনিক সুপ্রভাত সাতক্ষীরা শনিবার আটক কয়েক ব্যক্তির সাথে কথা বলেছে। যার ভিডিও সংরক্ষিত রয়েছে।
অনুসন্ধান বলছে, যারা আটক হচ্ছে তাদের অধিকাংশই মানসিক ভারসাম্যহীন। আটক ব্যক্তিরা কথা বাতা ঠিকভাবে বলতে না পারায় কিংবা তাদের কথা বার্তায় অস্পষ্টতা থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে সন্দেহ ঘণীভুত হচ্ছে।
অনুসন্ধান বলছে, শনিবার দুপুরে সাতক্ষীরা শহরের থানাঘাটায় রোহিঙ্গা সন্দেহে কুশখালীর শিউলি সরকার (৩৭)কে বেধরক মারপিটের পর পুলিশ তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। সন্ধ্যায় শিউলি সরকারের স্বামী শ্যামল সরকার ও মেয়ে পুজা সরকার তাকে থানা থেকে মুচলেকা দিয়ে বাড়ি নিয়ে যায়।
শনিবার দুপুরে থানাঘাটার মোল্লাপাড়ার আম বাগান থেকে আটক করা হয়েছিল তাকে। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায় শত শত মানুষের ভীড়।
স্থানীয়দের ধারণা, এই মহিলা বাঁশবাগানে একটা শিশুকে ইটের উপর শুইয়ে রেখেছিলো। পাশে একটা কাচিও ছিলো। লোকজন ধরেছে বলে শিশুটা বেঁচে গেছে। না হলে এই রোহিঙ্গা ওই শিশুকে জবাই করে দিতো। যা সম্পূর্ণ গুজব। দীর্ঘক্ষণ অনুসন্ধান করেও এর বাস্তবতা পাওয়া যায়নি।
অতঃপর আটক শিউলি সুপ্রভাত সাতক্ষীরাকে জানায়, তিনি সদর উপজেলার কুশখালি গ্রামের শ্যামল সরকারের স্ত্রী। তিনি ত্রিশ মাইলে তার মামার বাড়ি যাওয়ার পথে হঠাৎ তার মাথা ঘুরে পড়ে যায়, তারপর এলাকাবাসী তাকে মারতে থাকে। কুশখালি বলফিন্ডের পাশে তার বাড়ি। আহতাবস্থায় এর বেশি তথ্য সে দিতে পারেনি। তখন পুলিশের সহায়তায় তাকে থানায় নেয়া হয়। অতঃপর কুশখালি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শফিকুলের মাধ্যমে তার পরিবারকে সংবাদ দেওয়া হয়।
তার স্বামী শ্যামল সরকার জানান, শিউলি আজ সকালে ৩০ মাইলে তার মামার বাড়ি যাচ্ছিলো। তবে তার মাথায় মাঝে মাঝে সমস্যা হয়। থানাঘাটায় মোল্লাপাড়া এলাকায় পৌছুলে হয়তো তার মাথায় চাপ দিয়েছে। তাই এই অনাকাঙিক্ষত ঘটনা ঘটেছে। গ্রামবাসীর উচিৎ ছিল তাকে চিকিৎসা দেয়া। কিন্তু তারা তাকে বেধড়ক মেরে বেশি অসুস্থ করে দিয়েছে।
এদিকে, কালিগঞ্জ প্রতিনিধি জানায়, কালিগঞ্জে অপপ্রচার আর গুজবে বিভ্রান্ত হয়ে বিভিন্ন এলাকা থেকে রোহিঙ্গা সন্দেহে ৩ নারীসহ ৭ জনকে আটক করে পুলিশে দিয়েছে জনতা। শনিবার (১১ মে) পুলিশ জনতার হাতে আটক ব্যক্তিদের উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। তারা সকলেই মানসিক ভারসাম্যহীন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কালিগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হাসান হাফিজুর রহমান জানান, শনিবার সকাল থেকে বিভিন্ন এলাকায় জনতা রোহিঙ্গা সন্দেহে ৭জনকে আটক করেছে বলে খবর পাই। পরে পুলিশ সদস্যরা তারালী, রতনপুর ও কুশুলিয়ার চরযমুনা এলাকা থেকে তিন নারীকে এবং উপজেলা পরিষদ মোড়, উপজেলা সদরের ফুলতলা মোড়, ভদ্রখালী, কুশুলিয়া ও কৃষ্ণনগর এলাকা থেকে ৫ পুরুষকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসেন। আটককৃতরা নিজেদের নাম ঠিকানা সম্পর্কে কোন তথ্য দিতে পারছে না। তারা মানসিক ভারসাম্যহীন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। গুজব ও অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে ওসি হাসান হাফিজুর রহমান বলেন, শনিবার অন্যান্যদের মতো কুশুলিয়া থেকে আটক করা হয় মফিজুল ইসলাম (২৫) নামে এক ব্যক্তিকে। পরবর্তীতে কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের উত্তর রঘুনাথপুর গ্রামের রফিকুল ইসলাম উক্ত মফিজুল ইসলামকে নিজের ছেলে হিসেবে দাবি করে থানা থেকে বাড়ি নিয়ে গেছেন। থানা হেফাজতে থাকা ৭ জনকে রবিবার আদালতে প্রেরণ করা হবে। বিজ্ঞ আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ গৃহীত হবে বলে তিনি জানান।
এদিকে, এলাকাবাসীর মধ্যে রোহিঙ্গা ও ছেলেধরা সন্দেহে ব্যাপক গুজব ছড়িয়ে পড়েছে। এজন্য অপরিচিত কাউকে দেখলে তাদেরকে রোহিঙ্গা হিসেবে চিহ্নিত করে আটক করছে। অনেক ক্ষেত্রে মারপিটের ঘটনাও ঘটছে। তবে আটক ব্যক্তিবর্গকে রোহিঙ্গা বা ছেলেধরা হিসেবে ধারণা করলেও উপজেলার কোনো এলাকায় ছেলেমেয়ে নিখোঁজ হওয়া কিংবা ধরে নিয়ে যাওয়ার কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।
রমজাননগর প্রতিনিধি জানায়, শ্যামনগরের রমজাননগর ইউনিয়নের টেংরাখালী গ্রামে ছেলে ধরা সন্দেহে তিনজনকে আটক করে পুলিশে সোপ্দ করেছে এলাকাবাসী। জানা যায়, শনিবার (১১ মে) সকাল ৯টার দিকে টেংরাখালী গ্রামে তোরাপ সরদারের ছেলে জাকিরের বাড়িতে দুই জন ব্যক্তি প্রবেশ করে এবং বাড়ির চারিদিকে ঘুরাঘুরি করতে থাকে। এ সময় সন্দেহ হলে জাকিরের স্ত্রী এলাকবাসীকে সংবাদ দেয়। পরে এলাকাবাসী তাদের আটক করে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, প্রাক্তন ইউপি সদস্য মো. আব্দুল বারী ও ইউপি সদস্য আব্দুল হামিদ লাল্টুর নিকট নিয়ে যায়।
আটকৃত ব্যক্তিরা হলেন, মাগুরার সুজন শেখ (৪০) ও নাছিম শেখ (৫০)। তারা জানান, তারা মসজিদের চাঁদা কালেকশন করছিলেন। এলাকাবাসী ভুল বুঝে আমাদের আটক করেছে।
অপর দিকে মীরগাং এলাকা থেকে অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তিকে এলাকাবাসী ধরে একই স্থানে নিয়ে আসে। জানা যায়, ঐ ব্যক্তি বেশ কয়েক দিন যাবৎ পাগল বেশে মীরগাং এলাকায় ঘোরাফেরা করছিলেন। বিষয়টি শ্যামনগর থানাকে অবগত করা হলে এসআই আহাম্মাদ ও সঙ্গীয় ফোর্স ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে আটককৃতদের ইউনিয়ন পরিষদে নিয়ে পরে ছেড়ে দেন। তিনি জানান, সুজন ও নাছিম দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভিক্ষাবৃত্তি করে এবং একজন ভারতের পাগল। এ জন্য তাদেরকে যাচাই বাচাই করে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
