এস এম নাহিদ হাসান: স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, “জীবে প্রেম করে যেই জন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।” আর আমরা সবাই জানি মানবজীবনের অপরিহার্য অক্সিজেন দাতা পরিবেশের সবচেয়ে বড় বন্ধু ‘গাছ’। শুধু অক্সিজেনেই সীমাবদ্ধ নয়, গাছ আমাদের বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে যুগের পর যুগ রক্ষা করে আসছে। তাই সরকারের পক্ষ থেকে বেশি বেশি গাছ লাগানোর জন্য জনসাধরণকে উদ্বুদ্ধ করা হয়। বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি উদ্যোগে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচি পালিত হয়। কিন্তু এতো কিছুর পরেও আমরা সেই পরিবেশ বন্ধু গাছের উপর নির্যাতন অব্যাহত রেখেছি। গাছে গাছে পেরেক ঠুকে সাটানো হচ্ছে রঙ-বে-রঙের ফেস্টুন, প্লাকার্ড। শুধু পেরেক ঢুকানো নয়, গাছের সাথে তার পেচিয়েও কোচিং সেন্টার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নানান অখ্যাত অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের ফেস্টুন সাটানো হচ্ছে। এতে করে সড়কের গাছগুলোর জীবন রয়েছে ঝুঁকির মধ্যে। বিজ্ঞাপনের পেরেকে এরই মধ্যে মরে গেছে অনেক গাছ। পরিবেশবাদীদের দাবি, দ্রুত বিষয়টি নজরে এনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও জনসচেতনতা বাড়াতে পদক্ষেপ নেওয়া হোক।

সাতক্ষীরা শহরের সরকারি কলেজ মোড়, মহিলা কলেজ মোড়, শহিদ আব্দুর রাজ্জাক পার্ক, দীঘির পাড়সনহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠা বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ বিজ্ঞাপনই লাগানো হয়েছে গাছে গাছে পেরেক ঠুকে। এতে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঝুঁকছে মানুষের জীবন বাঁচানের অপরিহার্য উপদান বিলিকারী গাছ। গাছ আমাদের বন্ধু হলেও মানুষের নির্মম অত্যাচার থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই যে যেখানে পারছে পেরেক বা তারকাঁটার মাধ্যমে গাছকে বিজ্ঞাপনের জন্য ব্যবহার করে যাচ্ছে। এভাবে দিনের পর দিন গাছকে অনেকটাই বিজ্ঞাপন বুথের মতো ব্যবহার করায় ক্ষুব্ধ সচেতন নাগরিক সমাজ ও পরিবেশবাদীরা।
মানুষসহ প্রাণিকুলের বেঁচে থাকার জন্য পরিবেশের প্রধান উপাদান হচ্ছে গাছ। এই গাছেরও যে প্রাণ আছে, অনুভূতি আছে তা হয়তো ভুলতে বসেছে সংশ্লিষ্টরা। আর উপকারের প্রতিদান হিসেবে গাছে পেরেক মেরে মানুষ তারই প্রতিদান দিচ্ছে।
শহরের সৌন্দর্য রক্ষা ও পরিচ্ছন্নতা বিধানে সরকার ২০১২ সালে ‘দেয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন-২০১২’ পাস করে। কিন্তু এই আইনের কোনো কার্যকারিতা না থাকায় তা শুধু কাগজবন্দী হয়েই পড়ে আছে।

আইনের ধারা-৪ অনুযায়ী নির্ধারিত স্থান ব্যতীত অন্য কোনো স্থানে দেয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানো যাবে না। কিন্তু এসব দেখার যেন কেউ নেই। যত বড় গাছ ততবড় ফেস্টুন। গাছের শরীরে সাটিয়ে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন বিজ্ঞাপন। বড় বড় লোহার পেরেক গাছের শরীরে এমনভাবে গেঁথে দেওয়া হয়েছে যাতে সহজে কেউ খুলতে না পারে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের রাস্তার পাশের বড় বড় গাছগুলোকে টার্গেট করে এসব বিজ্ঞাপন টাঙানো হয়েছে। লোহার কারণে গাছের শরীরে পানি জমে পচন ধরে তা গাছের ক্ষতি করছে।
পরিবেশ নিয়ে আন্দোলনরত মানবাধিকার কর্মী অধ্যক্ষ আশেক ই এলাহী বলেন, প্রথমত ভাবতে হবে অন্য প্রাণির মত গাছেরও জীবন আছে। আমরা বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হতে যত্রতত্র গাছের গায়ে পেরেক দিয়ে বিজ্ঞাপন দিচ্ছি। মনে হয় গাছগুলোর জন্ম বিজ্ঞাপনের জন্য। এতে গাছের স্বাভাবিক গ্রোথ বাধাগ্রস্ত হয়। এটা বৃক্ষ নিধনের সামিল। প্রশাসনকে এর বিরুদ্ধে সজাগ হতে হবে।
জেলা নাগরিক কমিটির আহবায়ক অধ্যাপক আনিসুর রহিম বলেন, সরকারের আইন মেনেই সকল বিজ্ঞাপন দেওয়ার কথা থাকলেও তা মানা হয় না। যেকোন প্রতিষ্ঠান তার ইচ্ছামত ছোট বড় গাছে তাদের চমক প্রদ বিজ্ঞাপন ঝুলিয়ে দিচ্ছে। এতে গাছগুলোর জীবন ঝুঁকিতে পড়ছে। এর জন্য সরকারের আইন আছে, এর সঠিক প্রয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি আমাদেরও সচেতন হতে হবে।
