আরিফুল ইসলাম রোহিত: ২৭ মার্চ রাতে কালিগঞ্জের কুশুলিয়া ইউনিয়নের কাজী পাড়া গ্রামে দুর্ঘটনায় পড়ে আহত হয়েছেন বিষ্ণুপুর ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ রিয়াজ উদ্দীন- এমনটিই জানিয়েছেন সেসময় ইউপি চেয়ারম্যান শেখ রিয়াজ উদ্দীনকে উদ্ধার ও প্রাথমিক চিকিৎসাদানকারী গ্রাম পুলিশ শুকুর আলী। তিনি কুশলিয়া ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের গ্রাম পুলিশ (তার ভিডিও ও অডিও বক্তব্য সুপ্রভাত সাতক্ষীরায় সংরক্ষিত আছে)।
এদিকে, এই দুর্ঘটনাকে হামলা দাবি করে বুধবার সকাল থেকে সাতক্ষীরা-মুন্সীগঞ্জ সড়কের কালিগঞ্জ ফুলতলা মোড় এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে। দোষীদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার না করলে অনির্দিষ্টকালের জন্য হরতাল অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হবে বলে ওই সমাবেশ থেকে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। অবরোধ চলাকালে মৌতলার রাণীতলা গ্রামের আনিছুর রহমান (২৮) নামে সাঈদ মেহেদীর এক সমর্থক অবরোধ প্রত্যাখ্যান করে যাওয়ার চেষ্টা করলে তার মোটর সাইকেলের উপর হামলার ঘটনাও ঘটে। এসময় ছাত্রলীগের এক নেতাকে বেধড়ক মারপিটের ঘটনায় প্রত্যাহার করা হয়েছে এক পুলিশ সদস্যকে।

আন্দোলনকারীদের দাবি, গত ২৪ মার্চ অনুষ্ঠিত কালিগঞ্জ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সহিংসতার অংশ হিসেবে নবনির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাঈদ মেহেদী এবং তার কর্মী-সমর্থকরা রিয়াজ চেয়ারম্যানকে পিটিয়ে আহত করেছে। এসময় হামলায় আহত হয়েছে নারীসহ আরও ৬ জন। তাদের দাবি, বুধবার (২৭ মার্চ) দিবাগত রাত সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার কুশুলিয়া ইউনিয়নের কাজী পাড়া গ্রামে তার উপর হামলা চালানো হয়।
আহত ইউপি চেয়ারম্যানের পরিবারের সদস্য ও বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, বিষ্ণুপুর ইউপি চেয়ারম্যান নীলকন্ঠপুর গ্রামের নবীর শেখের ছেলে শেখ রিয়াজ উদ্দীন (৫৫), একই গ্রামের আমজাদ মোড়লের ছেলে তাহের মোড়ল (৪০) ও তার সহোদর আলাউদ্দীন মোড়ল (৩৪) মোটর সাইকেলযোগে বুধবার দিবাগত রাত ১০টার দিকে কালিগঞ্জ থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। তারা কুশুলিয়ার জোড়া আমতলা মোড় স্থানে পৌঁছালে উপজেলা চেয়ারম্যান সাঈদ মেহেদীর কর্মী সমর্থকরা তাদের ধাওয়া করে। এসময় প্রাণ রক্ষার্থে তাহের মোড়ল ও আলাউদ্দীন মোড়ল পাশ^বর্তী কাজী মাজীদ জাহাঙ্গীর মৃদুলের বাড়িতে আশ্রয় নেয়। তাদের ধরতে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে হামলা চালালে মৃত আব্দুল হান্নানের ছেলে কাজী মাজীদ জাহাঙ্গীর মৃদুল (৬০), তার স্ত্রী রেহেনা বেগম (৫০), মেয়ে তানিয়া খাতুন (২৫) ও কলেজ ছাত্রী মদিনা মনোয়ারা জুঁই আহত হয়। নারীদের উপর হামলার প্রতিবাদ করায় স্থানীয় মসজিদের ইমাম আমিরুল ইসলামকেও (৫৫) মারধর করা হয়। একই সময়ে চেয়ারম্যান শেখ রিয়াজ উদ্দীনকে ধাওয়া করে কুশুলিয়া স্কুল এন্ড কলেজ এলাকায় আটকানোর পর তারা লোহার রড ও বাঁশের লাঠি দিয়ে বেধড়ক মারপিট করে। এক পর্যায়ে অজ্ঞান হয়ে গেলে তাকে মৃত ভেবে ধানক্ষেতে ফেলে যায়। খবর পেয়ে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় পুলিশ আহত ইউপি চেয়ারম্যানকে এবং এলাকাবাসী তাহের মোড়ল, আলাউদ্দীন মোড়ল ও রেহেনা বেগমকে উদ্ধার করে কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। পরবর্তীতে অবস্থার অবনতি হওয়ায় শেখ রিয়াজ উদ্দীনকে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।

এর আগে গত ২৫ মার্চ বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ অফিসে তালা লাগিয়ে দেয় সাঈদ মেহেদীর অন্যতম সহযোগী সিদ্দিক মেম্বর ও সিরাজুল মেম্বর। পরদিন (২৬ মার্চ) বিকেলে বিষ্ণুপুর বাজার এলাকায় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ইউপি সদস্য নিরঞ্জন কুমার পাল ওরফে বাচ্চু পালকে মারপিট করে সাঈদ মেহেদীর কর্মী চাঁচাই গ্রামের মৃত মাদার মোড়লের ছেলে দিদারুল ইসলাম দিদার (২৪)। এ ঘটনায় নিরঞ্জন পাল বাচ্চু থানায় লিখিত অভিযোগ দিলে সেটি জিডি হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করেছে পুলিশ। নৌকা প্রতীকের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেয়ার ঘটনায় মারপিট ও দলীয় কার্যালয় দখলকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা হয়। এসব ঘটনার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার সকালে আওয়ামী লীগ ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সমিতি যৌথভাবে অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করে ফুলতলা মোড় এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীর অবস্থান নেয়। জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য অ্যাডভোকেট শেখ মোজাহার হোসেন কান্টুর সভাপতিত্বে ও ধলবাড়িয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সজল মুখার্জীর সঞ্চালনায় বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিরঞ্জন কুমার পাল বাচ্চু, চাম্পাফুল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক গাইন, রতনপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান আশরাফুল হোসেন খোকন, মথুরেশপুর ইউপি চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান গাইন, ইউপি চেয়ারম্যান সমিতির সভাপতি ও ধলবাড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান গাজী শওকাত হোসেন, তারালী ইউপি চেয়ারম্যান এনামুল হোসেন ছোট, কুশুলিয়া ইউপি’র সাবেক চেয়ারম্যান ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ডের সভাপতি শেখ মেহেদী হাসান সুমন, অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা নৌকা প্রতীকের প্রার্থী শেখ আতাউর রহমান প্রমুখ। আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে বক্তব্য রাখেন জাতীয় কৃষক জোটের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও ‘দৈনিক দক্ষিণের মশাল’ পত্রিকার সম্পাদক অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আশেক-ই-এলাহী।
প্রায় দু’ঘণ্টা ব্যাপী অবরোধ চলাকালে ফুলতলা মোড় গোল চত্বরের দু’পাশে শত শত যানবাহন আটকা পড়ে। খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার সরদার মোস্তফা শাহিন, কালিগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামিরুল ইসলাম জামি, থানার অফিসার ইনচার্জ হাসান হাফিজুর রহমান ও বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলে যেয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। এসময় হঠাৎ অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের গাড়িচালক কনস্টেবল হাসিব (কং নং-৮১৭) কুশুলিয়া ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি অয়েজ আহম্মেদকে বেধড়ক মারপিট করে আহত করলে পুনরায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এঘটনাকে কেন্দ্র করে অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন নেতৃবৃন্দ। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তাৎক্ষণিকভাবে দোষী পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার ও তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দিলে পরিস্থিতি শান্ত হয়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। ফুলতলা মোড় ও এর পাশ্ববর্তী এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
কালিগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ হাসান হাফিজুর রহমান জানান, এঘটনায় এখনও লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাঈদ মেহেদী কয়েকজন কর্মী-সমর্থক জানান, চেয়ারম্যান শেখ রিয়াজ উদ্দীনের উপর হামলার ঘটনা ঘটেনি। তিনি মোটর সাইকেল থেকে পড়ে যেয়ে আহত হয়েছেন।
এদিকে, বিকালে চেয়ারম্যান শেখ রিয়াজ উদ্দীনকে উদ্ধারকারী গ্রাম পুলিশ সাংবাদিকদের জানান, আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি রিয়াজ চেয়ারম্যানসহ দুটি মোটরসাইকেল পড়ে আছে। তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় দোকান থেকে মলম এনে লাগিয়ে দেই। এসময় রিয়াজ চেয়ারম্যানই আমাদের জানান তিনি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় পড়ে আহত হয়েছেন। এ সময় থেকে থেকে উদ্ধার হওয়া দুটি মোটরসাইকেলই তাদের ছিল।
