আরিফুল ইসলাম রোহিত: কিছুদিন ধরে সাতক্ষীরায় আম চাষের আবহাওয়া অনুকূলে যাচ্ছে না। তবে আম গাছে এখন গুটি আসতে শুরু করেছে। গুটিগুলো বাড়ছে প্রতিনিয়ত। আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় আমের গুটি রক্ষায় কৃষি বিভাগের পরামর্শে বাগান পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলার আম চাষীরা। কৃষি বিভাগ বলছে, বড় কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে জেলায় এ বছরও আমের বাম্পার ফলন হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঝড়-বৃষ্টিতে আমের মুকুলের ক্ষতি হওয়ায় হতাশা কাটছে না চাষীদের।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে জেলায় আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ হাজার মেট্রিক টন। এ বছর লক্ষ্য অর্জনে আম চাষের পরিধিও বাড়ানো হয়েছে।
কৃষি অধিদপ্তর জানায়, জেলায় চলতি মৌসুমে আম চাষ হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ১শ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ১ হাজার ২শ ৩০ হেক্টর, কলারোয়ায় ৬শ ৫০ হেক্টর, তালায় ৭শ ১৫ হেক্টর, দেবহাটায় ৩শ ৮০ হেক্টর, কালিগঞ্জে ৮শ ২৫ হেক্টর, আশাশুনিতে ১শ ৪০ হেক্টর ও শ্যামনগরে ১শ ৬০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে।
বাগানগুলো থেকে সম্ভাব্য উৎপাদন ধরা হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার ৯শ ৬০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ১২ হাজার ৫শ ১০ মেট্রিক টন, কলারোয়ায় ৬ হাজার ৩৫ মেট্রিক টন, তালায় ৭ হাজার ৬০ মেট্রিক টন, দেবহাটায় ৩ হাজার ৬শ ৮৫ মেট্রিক টন, কালিগঞ্জে ৮ হাজার ৮শ ২০ মেট্রিক টন, আশাশুনিতে ১ হাজার ২শ ৫০ মেট্রিক টন, শ্যামনগরে ১ হাজার ৬শ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
জেলায় আম বাগান রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৯শ ৮৯টি। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ১ হাজার ৫শ ৪০টি, কলারোয়ায় ১ হাজার ৩শ ৫০টি, তালায় ১ হাজার ৪শ ৫০টি, দেবহাটায় ৪শ ৭৭টি, কালিগঞ্জে ১শ ৪২টি, আশাশুনিতে ১শ ৯০টি ও শ্যামনগরে বাগান রয়েছে ১শ ৫০টি।
এদিকে, সাতক্ষীরা জেলা থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩১.৮৩ মেট্রিক টন এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২৭ মেট্রিক টন নিরাপদ ও বালাইমুক্ত আম রপ্তানি করা হয়েছে। এছাড়াও প্রায় ৫৮ মেট্রিক টন আম দেশের বিভিন্ন সুপারশপে পাঠানো হয়েছে। এসব আমের মধ্যে হিমসাগর, ল্যাংড়া, গোবিন্দভোগ ও আ¤্রপালির ভাগ বেশি।
এদিকে, বেসরকারিভাবে আম রপ্তানির পরিমাণ বাড়াতে সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়া ও উত্তরণ সফল প্রকল্পের আওতায় জেলার ৫শ কৃষককে প্রশিক্ষণ দিয়েছে।
সলিডারিডাডের সহযোগিতায় সদর উপজেলায় ১ হাজার ৫শ ৩০ বিঘা, তালায় ৩শ ৫০ বিঘা, আশাশুনিতে ৩শ ৫৫ বিঘা, দেবহাটায় ৩শ ২০ বিঘা, কলারোয়ায় ৩ হাজার ২শ বিঘা জমিতে আম বাগান প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে সদর উপজেলার ১শ ২৬ জন, তালার ২৬ জন, আশাশুনির ৩৭ জন, দেবহাটার ৩৬ জন ও কলারোয়ার ২৭৫ জন কৃষককে। প্রশিক্ষণে কৃষকের আন্তঃপরিচর্যা, সুষম সার প্রয়োগ, আগাছা দমন, ডাল ছাটাই, স্প্রে করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কলারোয়ার আম চাষী ডাবলু বলেন, এবছর আমের চাষ ভালো হবে বলে আশা করছি। গত কয়েকদিনে যে বর্ষা হয়ে গেল তাতে তেমন কোন ক্ষতি না হলেও আগামীতে ফলন আসার পর যদি আবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয় তবে লোকসানের সম্মুখীন হতে হবে।
সদর উপজেলার ব্রহ্মরাজপুরের আম চাষী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, অন্য বছরের তুলনায় এ বছর বেশ ভালো মুকুল হয়। তবে গত কয়েকদিনের বর্ষায় বেশিরভাগ মুকুল ঝরে গেছে। তবুও আগামীতে ফলন আসার পরে আর কোন দুর্যোগ না হলে আশা করা যায় বেশ ভালো লাভবান হবো।

সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়ার এসসিও মুস্তাফিজুর রহমান জানান, ২০১৫ সাল থেকে কৃষকদের নিয়ে সাতক্ষীরার আম রপ্তানিতে কাজ করে যাচ্ছে সলিডারিডাড। এবছর যাতে আরও বেশি বিষমুক্ত আম রপ্তানি হয় সেজন্য বেশি পরিমাণে কৃষককে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। গত কয়েকদিনের বর্ষায় বেশ ক্ষতি হয়েছে। তবে আর কোন দুর্যোগ না হলে ভালো ফলন আশা করা যায়।
তিনি আরও বলেন, সাতক্ষীরার আম শুধু বিদেশে রপ্তানি নয় বরং দেশের বাজারেই বেশি বাজারজাত করা সম্ভব।
খামার বাড়ির কৃষি অফিসার অরবিন্দ বিশ্বাস বলেন, এখন পর্যন্ত কিছু ক্ষতি হলেও পুরোটাই ভালো বলা যায়। আমের গুটি আসা শুরু করেছে। এখন বিভিন্ন বিষয়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এসব প্রশিক্ষণ নিয়ে কৃষক কাজে লাগালে অবশ্যই সফল হবে।

তিনি আরও বলেন, বিগত বছরগুলোতে রপ্তানির ক্ষেত্রে আমাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলেও জেলার আমের সুনাম পৌঁছে গেছে সারাদেশে। আর আমাদের এটাই অর্জন। তবে এবছর আমাদের আম যাতে দেশে আর দেশের বাইরে আরও বেশি পরিমাণ পাঠানো যায় এ ব্যাপারে আরও উদ্যোগ নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, এবছর ৫ম বারের মতো সাতক্ষীরার বিষমুক্ত আম রপ্তানি করা হবে ইউরোপের বাজারে। একই সাথে গুণে আর মানে সমৃদ্ধ এই আম যাবে দেশের বড় বড় সব সুপারশপে। সে লক্ষ্যেই আম চাষীরা বাগান নিয়ে বেশ ব্যস্ত সময় পার করছেন।
