আরিফুল ইসলাম রোহিত: বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মিজানুর রহমান। তার ডাক নাম খোকন। বাস করেন সাতক্ষীরা শহরের উত্তর পলাশপোল এলাকায়। ১৯৭০ সালে তিনি এসএসসি পাশ করেন সাতক্ষীরা পিএন হাইস্কুল থেকে। মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে ভারতের সেনাবাহিনীর কাছ থেকে ‘বেস্ট ফাইটার’ উপাধি পান। যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি ছিলেন ৮নং সেক্টরে।
দৈনিক সুপ্রভাত সাতক্ষীরার সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, তার যুদ্ধকালীন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ সব মুহূর্তের কথা।
মুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমান বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিলে আমি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকি। ২৫ মার্চ হত্যাকা-ের খবর পেয়ে ৪ এপ্রিল যশোরে চলে যাই। ওই সময় আমি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলাম। যশোরে গিয়ে আমি ছাত্র ইউনিয়নের এক নেতার বাসায় উঠলাম। সেখানে আমার সাথে এক আর্মির মেজরের পরিচয় হলো। নাম মেজর সালাহউদ্দীন। আমি তাকে বললাম আমি সাতক্ষীরা শহরের রাইফেলস ক্লাবের সদস্য। আমি যুদ্ধ করতে চাই। এর দুদিন পরে আমরা ঝিকরগাছায় চলে গেলাম। সেখানে আর্মি আক্রমণ করলে আমরা বেনাপোল দিয়ে ভারতে প্রবেশ করি। তখন এপ্রিল মাসের ১৩ তারিখ। কিন্তু বিএসএফ আমাদের আটকে দিলো। কারণ আমাদের কয়েকজনের হাতে তখন অস্ত্র ছিলো। বিএসএফ জানালো বাংলাদেশ থেকে অস্ত্রসহ কাউকে ভিতরে ঢুকতে দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। এছাড়া সেখানে আমাদের সাথে ইপিআর আর কিছু আর্মি ছিলো। আমরা একসাথে ৪০-৪৫ জন লোক ছিলাম।
আমরা সেখানে থাকতেই আমাদের বলা হলো যে, যারা সাতক্ষীরা রেঞ্জের লোক আছে তাদেরকে হাকিমপুরে যেতে হবে। কারণ সেখানে সাতক্ষীরা রেঞ্জের ক্যাম্প তৈরি হচ্ছে। এরপরে ১৬ এপ্রিল আমরা হাকিমপুর চলে গেলাম। হাকিমপুর গিয়ে দেখলাম কলারোয়ার আমানুল্লাহ, ডা. রাশেদ রেজা খান, জাহিদ হাসান খান, নজরুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন লোক আছে। তখন কেবল ক্যাম্প তৈরি করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। আমার আবার একটু সমস্যা ছিলো। আমি বাড়ি থেকে চুরি করে পালিয়ে গিয়েছিলাম, যে কারণে আমার যা পরা ছিলো তা ছাড়া আর কোন জামা-কাপড় ছিলো না। সেখান থেকে তাই আমাকে বাড়ি যেতে বললো। আমি আবার বাড়ি ফিরে এলাম। আমি আবার ফিরে যাবো কিন্তু তখনো আর্মি সাতক্ষীরায় আসেনি। হঠাৎ একদিন সন্ধ্যায় আমি নারকেলতলা মোড় থেকে সামনে দাঁড়িয়ে আছি। এমন সময় সাঁই সাঁই করে খান সেনাদের কিছু গাড়ির বহর চলে আসলো। আমাকে জিজ্ঞেস করলো, সরকারি স্কুলটা কোন দিকে? আমি দেখিয়ে দিলাম। আর ওরা যেতে শুরু করলেই আমি জয় বাংলা বলে দৌড় দিলাম। আমার অজান্তেই মুখ দিয়ে বের হয়ে আসলো ‘জয় বাংলা’। সময়টি ছিল তখন এপ্রিল মাসের ২০ তারিখ।
মিজানুর রহমান বলেন, পরদিন আমি স্কুলের পাশে গেলাম খান সেনারা কি করছে তা দেখার জন্যে। গিয়ে দেখি স্কুলের পিছনে অনেক মানুষ মেরে গণকবর দেওয়া হয়েছে। এই দৃশ্য দেখে আমি চলে গেলাম হাকিমপুর। সেখানে গিয়ে দেখি আরও ৪০-৪৫ জন লোক চলে এসেছে। সেখানে আমরাই ছিলাম প্রথম ব্যাচ। ট্রেনিং দিলো বিএসএফ আর ইপিআর’র সদস্যরা। সেখানে আমাদের ক্যাম্প কামান্ডার ছিলো ক্যাপ্টেন শফিউল্লাহ। আর গ্রুপ কমান্ডার ছিলো সুবেদার উবায়েদউল্লাহ।
তিনি আরও বলেন, ট্রেনিংকালীন সময়েই আমরা প্রথম অপারেশনে যাই হিজলদী বিওপি ক্যাম্পে। সেই বিওপি ক্যাম্প আমরা পুড়িয়ে দিলাম। আর এই ক্যাম্প পুড়িয়ে দেওয়ায় খান সেনারা সোনাই নদীর এপারে অবস্থান নেয়। আর আমরা ভারতের ওপারে। দু’পার থেকেও যুদ্ধ হয়।
এদিকে, মে মাসের শেষে আমাদেরকে চাকুলিয়াতে ট্রেনিং করতে পাঠানো হলো। সেখানে আমাদের ভাদলির আবুল কালাম, ইটাগাছার মেজর হাফিজ ছিলো। এছাড়া ঢাকার কিছু ছেলে ছিলো। তবে চাকুলিয়াতে আমরা দ্বিতীয় ব্যাচে ট্রেনিং নিলাম। ১ মাসের ট্রেনিং-এ আমি দলের ৬ উইং-এ ছিলাম। সেখানকার একটা ঘটনা খুবই হৃদয়বিদারক। কারণ সেখানে প্রচুর সাপের উৎপাত ছিলো। আমাদের চারজন যোদ্ধা মারা গেল সাপের কাঁমড়ে। এরপরে সেখান থেকে ৩০ জনকে নির্বাচিত করা হলো। আমিও নির্বাচিত হলাম। নির্বাচিতদের কমান্ডো ট্রেনিংয়ের জন্য রামগড় ক্যান্টনমেন্টে পাঠানো হলো। সেখানে ২৭ দিন ট্রেনিং হলো। কমান্ডো ট্রেনিং নেওয়ার সময় আমাদের দিনে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ২০ ঘণ্টা ট্রেনিং করানো হতো। আমার কমান্ডো নম্বর ছিলো ২৪১২। ট্রেনিং শেষে আমাদের আবার হাকিমপুর পাঠানো হলো।
তিনি জানান, হাকিমপুর থেকে আমাদের কাকডাঙ্গা-বেলেডাঙ্গার যুদ্ধে পাঠানো হলো। আমার কাছে দেওয়া হলো লাইট মেশিনগান (এলএমজি)। কাকডাঙ্গা মাদ্রাসায় খানেদের ক্যাম্প ছিলো। আর সেখানেই আক্রমণ হলো। আমাদের সাথে ছিলো গ্রুপ কমান্ডার সুবেদার উবায়েদউল্লাহ। কুশখালীর শামসুর, মোমেন, সুলতানপুরের হারণ অর রশিদ, আব্দুল্লাহ সরদার। তবে সেখানে গাড়াখালীর মুনসুর আলী মারা গেল। এই মুনসুর আলীর কবর ২০১৩ সালে পাঁকা করে দিয়েছি।
এদিকে, এই অপারেশন শেষ হওয়ার পরে আমাদের ৩৩ জনের একটা গ্রুপ করে দেওয়া হলো। সেই গ্রুপে আমি আর বাগেরহাটের একটা ছেলে ছিলাম। সেখানে আমাদের সাথে ছিলো আব্দুল কাদের, দিলীপ কুমার দে, আব্দুর রশিদ, রতন কুমার দাশ, কাজী নাজমুল হক, মিন্টু। এতেও আমাদের গ্রুপ কমান্ডার ছিলো সুবেদার উবায়েদ উল্লাহ।
মিজানুর রহমান সাতানী স্কুলে পাক বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। সেখানে হত্যা করেছেন কয়েকশ পাক সেনাকে।
সেই ঘটনার বিবরণে তিনি বলেন, সাতানী স্কুলে আমরা পজিশন নিয়ে বসে আছি। আমাদের বেশ কিছু বাঙ্কার তৈরি ছিলো। ভোর থেকে যুদ্ধ শুরু হলো। দুপুরের দিকে আমি আর সুবেদার উবায়েদউল্লাহ একটা ঘরে খাচ্ছিলাম। পাশের গ্রাম থেকে কেউ একজন আমাদের জন্য রুটি আর হালুয়া এনে দিয়েছিল। আমার খাওয়ার সময় উবায়েদ উল্লাহ জানালা দিয়ে বাইরে পাহারা দিয়েছেন। আর আমার খাওয়া হয়ে গেলে তাকে খেতে বললাম। উবায়েদ উল্লাহ’র কাছে ছিলো চাইনিজ এলএমজি। আর আমার কাছে সাধারণ এলএমজি। আমি আমার এলএমজিটা সেট করে নিয়ে জানালা দিয়ে সামনে তাকিয়ে আছি। জানালার ওপারে ছিল বিশাল ধানের ক্ষেত। হঠাৎ দেখি ধান গাছ দুলছে। কিছু সময় এরকম দোলা দেখে বুঝতে পারলাম কেউ নিশ্চয়ই সেখানে আছে। একটা সময় পর হঠাৎই একজন মেজর (পরে তার নাম শুনেছি জানজুয়া) দাঁড়িয়ে নির্দেশ দিলেন সবাইকে সামনে যেতে। আর অমনি আমাদের দিকে সবাই একযোগে বৃষ্টির মতো গুলি করতে শুরু করলো। আমিও প্রস্তুত ছিলাম, একটানা গুলি করতে শুরু করলাম। ১০টার বেশি ম্যাগজিন ছিলো। একে একে সব ম্যাগজিন খালি হয়ে গেলো।
এদিকে, চারিদিকে আমাদের তৈরিকৃত বাঙ্কার থেকেও গুলি শুরু হয়েছে। যে কারণে তারা সুবিধা করতে পারেনি। সুবেদার উবায়েদ উল্লাহকে আমি বললাম, ভাই আপনি এবার দেখেন আমার কিন্তু আর গুলি নেই। পরে শুনেছি তাদের প্রায় ১৫০-২০০ জন সেনা মারা গেছে। তাদের লাশ গাড়িতে করে পরদিন সকালে যশোরে নিয়ে যাওয়া হয়।
এদিকে সন্ধ্যে হয়ে যাওয়ার পরপরই আমরা নির্দেশ দিলাম সকল যোদ্ধাদের চলে যেতে হবে। সকল মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে চলে গেলাম ভারতের আমুদিয়া বাজারে। পরে শুনলাম সেদিন রাতেই সেখানে আগরদাড়ি, মাধবকাটি ও বৈকারী বাজার এই তিনদিক থেকে পাক বহিনী আক্রমণ করেছে। কিন্তু আমরা কেউই সেখানে ছিলাম না। পরে তার পাশের একটি ঋষি পাড়ায় আগুন লাগিয়ে দেয় পাক বাহিনী। পরের দিন আবার আমরা সাতানী স্কুলে আসলাম। তখন ছিলো বর্ষাকাল। ওই এলাকায় এত বর্ষা হয়েছিলো যে, ভারত থেকে অস্ত্র গোলাবারুদ আনা সম্ভব হচ্ছিল না। তাই আমরা তলুইগাছায় সাতক্ষীরা কলেজের শিক্ষক রফিউদ্দিনের বাড়িতে ক্যাম্প করলাম। সেখান থেকে আগরদাড়ি ক্যাম্পে আক্রমণ করেছি।
মুক্তিযোদ্ধা মিজান ছিলেন কমান্ডো ট্রেনিং প্রাপ্ত যোদ্ধা। আর তাই কপিলমুনি থেকে ভোমরা আর কলারোয়ার মাঝ বরাবর পর্যন্ত সর্বত্রই ছিল তার যাতায়াত। এক এক সময় এক এক গ্রুপে গিয়ে যুদ্ধে অংশ নিতেন আবার সেখান থেকে আরেক গ্রুপে চলে যেতেন।
তিনি আরও বলেন, যুদ্ধের মাঝপর্যায়ে একদিন আমরা ঝাউডাঙ্গা বাজারে আক্রমণ করলাম। সেখানে কোন পাক সেনা ছিল না। কিছু রাজাকার ছিল। তারা দৌড়ে পালিয়ে গেল। আমরা ঝাউডাঙ্গা মাদ্রাসায় গেলাম। সেখানে একটি দরজা বন্ধ ছিলো। আর সেখান থেকে মেয়েদের আর্তচিৎকার ভেসে আসছিলো। আমরা গিয়ে দরজা ভেঙে ফেললাম। দেখলাম ৮জন মহিলা সেখানে পড়ে রয়েছে। তাদের আজও ভুলতে পারি না। তাদের শরীরে কোন কাপড়-চোপড় ছিলো না। আর সারা শরীরের বিভিন্ন জায়গায় বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করা হয়েছে। তাদের বেঁচে থাকার মতো অবস্থা ছিলো না। শুনেছি ওদের ধরে নিয়ে এসেছিলো মতিয়ার নামে এক রাজাকার। আমরা পরে একসময় তাকে মেরে দিয়েছি। এই মহিলাদেরকে গরুর গাড়িতে করে হাকিমপুর নিয়ে গেলাম। সেখান থেকে বারাকপুর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিলো।
এদিকে ভোমরার যুদ্ধেও আমাকে সহযোগিতা করতে হয়েছে। সেখানে একটা গ্রুপে যোগ দিলাম। ভোমরায় একটানা ১৭ ঘণ্টা যুদ্ধ হয়েছিলো। কিন্তু আমাদের বাহিনী সেখানে টিকে থাকতে না পেরে চলে যায়। আর এই সুযোগে পাক বাহিনী ভোমরার পথ দখল করে নেয়। আমরা গিয়েছিলাম ভোমরার ওই ঘাঁটি উদ্ধার করতে।
এছাড়া ভাড়–খালীতেও অপারেশন করলাম। সেখান থেকে বেলেডাঙ্গায় চলে আসলাম। মেজর মঞ্জুর আমাদের কমান্ডার ছিলেন। আর ক্যাম্পের ইনচার্জ ছিলো মাহবুব। সেখানে চারদিনব্যাপী যুদ্ধ হলো। শেষে আমাদের গুলি বারুদ প্রায় শেষ হয়ে গেলো। তবে এখানে আমাদের কিছু সমস্যা ছিলো। যে কারণে আমাদের ফিরে যেতে হয়েছিলো। আমরা গুলি বারুদ ছাড়াই পাক বাহিনীর ওপরে আক্রমণ করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু নতুন করে যশোর থেকে কমান্ডো বাহিনী আনা হলে আমাদের কোণঠাঁসা করে ফেলা হলো। সেই যুদ্ধ থেকে সুবেদার তোবারক উল্লাহসহ বেশ কিছু যোদ্ধাকে ধরে নিয়ে গেল পাক সেনারা। আর বেশ কয়েকজন মারা গেল। আর কয়েকজন হলো আহত। মাহবুব কমান্ডারও আহত হলেন। পরে আমরা পাক বাহিনীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে মাধবকাটি বাজারের ব্রিজ উড়িয়ে দিলাম।
সবচেয়ে কঠিন সময় গেছে সাতক্ষীরার ছয়ঘরিয়ায় পাক বাহিনীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্যে মাইন বিস্ফোরণের সময়। ছয়ঘরিয়া মোড়ের পাশে কয়েকটি মাইন পেতে রাখলাম। কিন্তু বিস্ফোরণ হতে দেরি হওয়ায়, আমার সাথে থাকা আগরদাড়ির সফেদ আলী দেখতে গেল কি অবস্থা। আমি তাকে বার বার নিষেধ করা সত্ত্বেও সে দাঁড়ালো। যেই দেখতে গিয়েছে অমনি মাইনের বিস্ফোরণ হলো। আর সাথে সাথে পাক হানাদারদের গুলি আসতে লাগলো। আমার পেট বরাবর একদম এক ঝাক ব্রাশ লাগলো। আর সফেদ আলীর পুরো গায়ে গুলিতে ভরে গেল। মাইন বিস্ফোরণের কারণে আমার কপালে, হাতে আর বিভিন্ন জায়গায় স্পিøন্টার লাগলো। আমার ভাগ্য ভালো ছিলো যে, আমার পেটে ম্যাগজিন ছিলো। ম্যাগজিনগুলোর কারণে পেটে গুলি লাগেনি। তবে আমি একেবারে রক্তাক্ত হয়ে গেলাম। আমাকে সাথে সাথে নিয়ে যাওয়া হলো ভারতের হাসপাতালে। তিন-চারদিন পরে আমার জ্ঞান ফিরলো। ভারতের চার চারটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে আমি সুস্থ হয়ে ফিরলাম। পরে আমি আখড়াখোলা-রায়পুর যুদ্ধে অংশগ্রহণ নিয়েছি। যুদ্ধ শেষে আমি সাতক্ষীরা কলেজে ক্যাপ্টেন শফিউল্লাহর কাছে অস্ত্র জমা দিয়েছিলাম।
