সৌমেন মজুমদার, তালা:
বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন গাজী। পরিবারের অভাব অনটনের কারণে তালা সদর ইউনিয়নের জিয়ালা নলতা গ্রামের বাসিন্দা আবুল হোসেন গাজী প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করতে পারেননি। প্রচ- কায়িক শ্রমের মধ্যদিয়ে দিন পার হতো তার। যখন তার বয়স ১৭ কি ১৮, তখন দেশের পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকে। বঙ্গবন্ধু সকলকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের আহবান জানান। সেই আহবানেই তিনি দেশ মাতৃকার টানে ঝাপিয়ে পড়েন যুদ্ধে।
যুদ্ধজীবনের নানা ঘটনা তুলে ধরে দৈনিক সুপ্রভাত সাতক্ষীরাকে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণ শোনার পর আমিসহ আমাদের গ্রামের কিছু লোক মিলিত হয়ে যুদ্ধে যাবার ব্যাপারে আলাপ আলোচনা করি। সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমি, আলাউদ্দিন মাস্টার, ইবাদুল পাড়, আশরাফ হোসেন, আব্দুল হাইসহ ৫ জন শুক্রবার তেতুলিয়া মসজিদের সামনে থেকে ঝাউডাঙ্গা হয়ে কলারোয়া যায়। আগোলঝাড়ার আলফাজ নামের এক লোকের মাধ্যমে টাকার বিনিময়ে আমরা বর্ডার পার হই। আমুদি বর্ডার এ পৌঁছানোর পর নৌকা যোগে গেলাম ওপারের তেতুলিয়া ব্রিজ। তখন রাত প্রায় ৮টা। সেখানে প্রচুর শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছিলো। সেখানে কিছু দেশীয় লোকের দেখা পেলাম, তাদের মাধ্যমে জানতে পারলাম ট্রেনিং নিতে হলে বশিরহাট যেতে হবে। বশিরহাট প্রায় ৪০ মাইল দূরে। ট্রাক যোগে আমরা সেখানে যাই। বশিরহাটে জয় বাংলা অফিসে গেলাম প্রথমে। সেখানে দায়িত্বে ছিলো গফুর সাহেব এবং আমাদের সাকি সাহেব। ওখানে কিছু দিন আমাদের প্রাথমিক ট্রেনিং হয়। সেখান থেকে টাকিপুর ক্যা¤েপ ৫ দিন প্যারেড ট্রেনিং করি। ওখান থেকে আমাদের নিয়ে যায় রাজারহাট আম বাগান। পরদিন সকাল ৭টায় আমাদের জন্য গাড়ি আসে। আমরা খুলনা লাইনে দাড়াই। গাড়িতে করে ৩ দিন ২ রাত পর চলে যাই বিহার প্রদেশের সিংভুম জেলার চাকুলিয়া বিমান বন্দরে গেরিলা ট্রেনিং এর জন্য। এইট উইংস এ আমরা ট্রেনিং করি। ট্রেনিং ছিলো খুবই বিপদজনক। সাপ, কাকড়া বিছার ভয়তো ছিলোই। অনেক বিপদের মধ্যে ১ মাস ৫ দিন ট্রেনিং শেষে ফিরে আসি বাগুন্দিয়া ক্যা¤েপ। বাগুন্দিয়া ক্যা¤প থেকে আমাদের অস্ত্র দিয়ে দিলো। আমাকে দিয়েছিলো এসএলআর। বাগুন্দিয়া ক্যা¤প থেকে আমরা বাংলাদেশে প্রায় সময় পেট্রোল ডিউটিতে আসতাম। কয়েকদিন পর কাকডাঙ্গা বর্ডার পার বাংলাদেশে ঢুকি প্রায় ১০০ জন এক সাথে। তবে আলাদা আলাদা গ্রুপ ছিলো। আমার গ্রুপের ওস্তাদ ছিলেন আব্দুর রউফ সাহেব। আমাদের গ্রুপে ছিল ৩৫ জন। হঠাৎ একদিন বিকট গুলির শব্দ শুনে ওস্তাদ পজিশন নিতে বললেন। আমাদের কাছে গুলি কম থাকায় ১০টা গুলির পরিবর্তে আমরা ১টা গুলি করতে থাকি। সম্ভবত ৩ রাত ২ দিন একটানা যুদ্ধ করেছিলাম আমরা। খানেদের কোন লাশ আমরা পাইনি, কারণ ওরা লাশ গাড়িতে করে নিয়ে চলে গিয়েছিল। তবে অসংখ্য মৃতের আলামত পেয়েছিলাম। ওই অঞ্চলে কোন গাছের মাথা ছিলো না। যুদ্ধ শেষে সিআরপি এসে আমাদের আবার ভারতে নিয়ে গেলো চিকিৎসার জন্য। কিছুদিন পর ভারত থেকে কুশখালি বর্ডার দিয়ে পার হয়ে ওখানে এক রাত কাটালাম। সেখান থেকে পরের রাতে আসলাম সরুলিয়া ঘোষপাড়ায়। ওখান থেকে বাড়ি যাওয়ার আর কোন উপায় খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পাটকেলঘাটার রাজাকার ক্যা¤প, খান সেনারা টহল দিচ্ছে পথে পথে। চারিদিকে বিপদ। তারপর কোন রকমভাবে বাদলপুর খেয়া পার হয়ে ধলবাড়ি মোড় হয়ে তেতুলিয়া দিয়ে যখন আমরা আটারই পৌঁছালাম তখন রাত পার হয়ে যায়। এরপর আশ্রয় নিলাম কাটবুনিয়া হিন্দুদের ফেলে রেখে যাওয়া একটা বাড়িতে। তৎকালীন নকশালদের সাথে আমাদের যুদ্ধ বাধে। তারা মানুষের গলা কাটতো, ডাকাতি করতো, নারী নির্যাতন করতো তারা। যে কোন উপায়ে আমরা আমাদের চলার পথ পরিষ্কার করি। তখন পাটকেলঘাটা রাজাকার ক্যা¤প, চুকনগর রাজাকার ক্যা¤প আর কপিলমুনি রাজাকার ক্যা¤প ছিলো বড় ক্যা¤প। ৯নং সেক্টরের মেজর এমএ জলিলের নেতৃত্বে যুদ্ধ শুরু করি। আমি কপিলমুনি রাজাকার ক্যা¤েপ আক্রমণে সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। রাজাকাররা আত্মসমর্পণ করার পর বাড়ির ভেতর দেখা গেলো সৈয়দ নামের একটা লোক, যার বাড়ি মাছিয়াড়ায়। রাজাকাররা তাকে বিল্ডিং এর সাথে ৪ হাত পায়ে পেরেক মেরে টানিয়ে রেখেছে। আমার জানা মতে ৯৬ জন রাজাকার আত্মসমর্পণ করে। পরে তাদের হত্যার মধ্যদিয়ে এলাকা রাজাকার মুক্ত হয়।
আস্তে আস্তে এক সময় দেশ স্বাধীন হলো। আমরা ফিরে পেলাম আমাদের লাল সবুজের পতাকা। বঙ্গবন্ধু দেশের ফেরার পর অস্ত্র জমা দেই সাতক্ষীরাতে।
