এস.এম নাহিদ হাসান: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র ছয় দিন। এ নিয়ে সাতক্ষীরা-১ আসনের সর্বত্রই বিরাজ করছে নির্বাচনী আমেজ। মিছিল, পথসভা, মাইকিংয়ে কোথাও উৎসাহ-উদ্দীপনা, আবার কোথাও বা অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, বোমা বিস্ফোরণে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। তারপরও নির্বাচন নিয়ে আগ্রহের কমতি নেই কোথাও। ইতোমধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা নিজ নিজ দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে নির্বাচনের প্রাথমিক প্রস্তুতি শেষ করেছেন। এখন চলছে গণসংযোগ, মাইকিং।
সাতক্ষীরা-১ আসনের তালা-কলারোয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নির্বাচন নিয়ে রীতিমত চায়ের কাপে ঝড় তুলছেন সাধারণ মানুষ। কোথায় কি হচ্ছে, কখন কোথায় কোন প্রার্থীর পথসভা, কোথায় কি ঘটলো, প্রার্থীদের কার কি যোগ্যতা, হলফনামায় কোন প্রার্থী কি লিখেছেন, আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জাতীয় পার্টির কি অবস্থা-এছাড়াও নিজেদের নির্বাচনী এলাকার বাইরে গিয়ে হিরো আলম কি বললো-তা নিয়েও চায়ের দোকানগুলো হয়ে উঠছে এক একটি টক শো স্টুডিও।
এসব চায়ের দোকানের আলোচনা-পর্যালোচনা থেকে উঠে আসা তথ্য এবং দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরা-১ আসনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী মুস্তফা লুৎফুল্লাহকে বিজয়ী করতে সকল ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে তালা ও কলারোয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। প্রতিদিন নৌকা প্রতীকের প্রার্থী মুস্তফা লুৎফুল্লাহকে সঙ্গে নিয়ে আওয়ামী লীগের উপজেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ তৃণমূলে গিয়ে গণসংযোগ করছেন, ভোট চাচ্ছেন দ্বারে দ্বারে।
অপরদিকে, ধানের শীষের প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম হাবিব দীর্ঘদিন পর এলাকায় ফিরে গণসংযোগ শুরু করলেও তার প্রচারে হামলা-মামলা-বাধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে দলটির। সম্প্রতি এ ব্যাপারে সিইসির কাছে অভিযোগ করেছেন তিনি। তার অভিযোগের বিষয়বস্তু নিয়েও ঝড় উঠছে চায়ের কাপে।
অন্যদিকে, সাতক্ষীরা-১ আসনে জাতীয় পার্টির দলীয় প্রার্থী সৈয়দ দিদার বখতকে নিয়েও আলোচনার শেষ নেই। তার উপস্থিতি নির্বাচনের মাঠে কি প্রভাব ফেলবে- তা নিয়ে ভোটাররা চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন।
সবমিলিয়ে সাতক্ষীরা-১ আসনে নৌকা, ধানের শীষ ও লাঙল প্রতীকের মধ্যে ত্রিমুখি লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
সূত্র জানাচ্ছে, এ আসনে আওয়ামী লীগ নেত্বতাধীন মহাজোট মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য ও সাতক্ষীরা জেলা সভাপতি মুস্তফা লুৎফুল্লাহ এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী বিএনপির কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক ও সাতক্ষীরা জেলার সাবেক সভাপতি হাবিবুল ইসলাম হাবিবের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্টির দলীয় প্রার্থী সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ দিদার বখত মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার না করায় ভোটের সমীকরণ আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
তবে, এখন পর্যন্ত পোস্টার টাঙানো, নির্বাচনী সভা ও গণসংযোগে এগিয়ে আছেন নৌকা প্রতীকের প্রার্থী মুস্তফা লুৎফুল্লাহ। তিনি আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সাথে নিয়ে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। আওয়ামী লীগের প্রতিটি ইউনিট বর্ধিত সভা করে নৌকা প্রতীকের বিজয়ে এখন ঐক্যবদ্ধ। যদিও ধানের শীষের প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম হাবিবের অভিযোগ, তার নেতা-কর্মীদের নির্বাচনী প্রচার চালাতে দেওয়া হচ্ছে না। তিনি মনোনয়ন পাওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত দলীয় দেড় শতাধিক নেতা-কর্মীকে আটক করা হয়েছে। মারধর করা হচ্ছে কর্মী সমর্থকদের। ছিড়ে ফেলা হচ্ছে পোস্টার। মারধর করে আবার উল্টো মামলাও দেওয়া হয়েছে তারসহ বিএনপি কর্মীদের নামে।
অন্যদিকে, জাতীয় পার্টির দলীয় প্রার্থী সৈয়দ দিদার বখতও সাধ্যমতো প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তার প্রচার গাড়িও ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ভোটের মাঠে ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী জাতীয় পার্টির প্রার্থী ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ দিদার বখতের উপস্থিতির বিষয়টি দেখছেন দুইভাবে।
একাংশের মতে, লাঙল প্রতীকের কারণে ক্ষতির সম্মুখীন হবেন মহাজোটের প্রার্থী মুস্তফা লুৎফুল্লাহ। সেক্ষেত্রে সুবিধা পাবেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম হাবিব।
আবার, অপর অংশের মতে, জাতীয় পার্টির সৈয়দ দিদার বখত বিএনপি-জামায়াতের একটি বড় অংশের ভোট লাঙল প্রতীকে আনতে সক্ষম হবেন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ধানের শীষের প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম হাবিব। সেক্ষেত্রে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী মুস্তফা লুৎফুল্লাহ এগিয়ে যাবেন।
সবমিলিয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরা-১ আসনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাপার তিন হেভিওয়েট প্রার্থীর মধ্যে লড়াই হবে ভোটের।
এ প্রসঙ্গে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী মুস্তফা লুৎফুল্লাহ বলেন, নৌকা প্রতীকের বিজয়ে তালা-কলারোয়ার আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাসহ সাধারণ মানুষ ঐক্যবদ্ধ। বিজয় নিশ্চিত।
ধানের শীষের প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম হাবিব বলেন, নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমাদের নির্বাচনে এনেছে। কিন্তু চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রচারে বাধা, গণগ্রেফতার, কর্মী-সমর্থকদের মারপিট করা হচ্ছে। এভাবে ভাল নির্বাচন হতে পারে না। তারপরও ভোট নিরপেক্ষ হলে ধানের শীষের বিজয় ঠেকাতে পারবে না কেউ।
লাঙল প্রতীকের প্রার্থী সৈয়দ দিদার বখত বলেন, প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে এই এলাকার মানুষের জন্য সাধ্যমত কাজ করেছি। মানুষ আমাকে মনে রেখেছেন। আশা করি ভোটের দিন ব্যালটেই তার প্রতিদান দেবেন।
প্রসঙ্গত, সাতক্ষীরা জেলার দুটি উপজেলা ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত সাতক্ষীরা-১ আসনে ভোটার সংখ্যা চার লক্ষ ২২ হাজার ৮৯৮। এই আসনে উল্লিখিত তিন প্রার্থীসহ ছয় জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
বাকি তিন প্রার্থী হলেন ইসলামী আন্দোলনের এফএম আছাদুল হক (হাত পাখা), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির আজিজুর রহমান (কাস্তে) ও ন্যাশনাল পিপলস পার্টির আব্দুর রশিদ (আম)।
