বাহলুল করিম: বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সাতক্ষীরা শাখার সভায় বক্তারা বলেছেন, প্রাইভেট ক্লিনিকের ওপর সরকার যে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে তা যদি বাস্তবায়ন হয় তবে দেশের ৯৫% ক্লিনিক বন্ধ হয়ে যাবে। এখন সময় আমাদের একত্রিত হওয়ার। ক্লিনিক নবায়নের জন্য কত টাকা ধার্য করা হয়েছে সেটা আমরা জানতে চাই। যখন মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয় তখন সব দেখানো হয়। সরকারি হাসপাতালে কী সবগুলো পদে ডাক্তার আছেন? নেই। তবে ক্লিনিকগুলোর উপর কেন এত চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। ক্লিনিক নবায়নের সময় অনেক কাগজপত্র জড়ো করতে হয়। মোটা অংকের টাকা দেই কিন্তু লাইসেন্স পায় না। এবারের সংগ্রাম আমাদের বাঁচার সংগ্রাম। কেন্দ্রীয় সভাপতি পর্যন্ত যাওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই। প্রধানমন্ত্রী তো দূরের কথা। ভেবেছিলাম আমাদের সমিতি গঠিত হয়েছে এবার আমরা শান্তিতে কাজ করতে পারবো। কিন্তু আমরা বিভিন্ন সময়ে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। আমাদের সমিতি যেন বন্ধ না হয় ও লাইসেন্স পেয়ে ভালভাবে কাজ করতে পারি কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের কাছে এটাই আমাদের দাবি। বর্তমান সরকার মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। আমরা প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে মানুষকে স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে যাচ্ছি। ক্লিনিক নবায়নের ক্ষেত্রে সরকার যে শর্ত দিয়েছে তা করা আমাদের পক্ষে কখনো সম্ভব নয়। আমাদের দাবি যদি ওনারা না মানেন তাহলে আমরা আন্দোলনে যাবো। মানুষ ৩০-৪০% সরকারি স্বাস্থ্য সেবা পায়। বাকি ৬০% স্বাস্থ্য সেবা আমরা দিয়ে থাকি। সাধারণ গরীব ও অসহায় মানুষকে আমরা স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছে দিচ্ছি। এর সাথে আমাদের রুটি-রুজি জড়িত। ক্লিনিক যদি বন্ধ হয়ে যায় তবে হাজার হাজার মানুষ বেকার হয়ে পড়বে। আমাদের রুটি-রুজি বন্ধ হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে একটি সহজ পদ্ধতি আনা উচিত। যা আমাদের জন্য সহনীয় পর্যায়ে থাকে। ক্লিনিকগুলো বন্ধ হলে দেশে বেকারত্ব বেড়ে যাবে।
শনিবার (১ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টায় জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সংগঠনের বিশেষ সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
বক্তারা আরও বলেন, সাতক্ষীরা জেলায় এক’শ থেকে দেড়’শর অধিক ক্লিনিক রয়েছে। সবার জন্য পরিবেশ সনদ আনা কী সম্ভব? ক্লিনিক নীতিমালা বিগত দিনে যা ছিল তা সহজ ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে এমন একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যা ক্লিনিক মালিকদের পক্ষে মানা অসম্ভব। যে নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে এটি যদি বাস্তবায়ন হয় তবে ক্লিনিকের কার্যক্রম চালানো সম্ভব হবে না। ফলে ক্লিনিকগুলো বিলুপ্ত হবে। আগে যে পদ্ধতিতে নবায়ন হতো তা আমরা খুব সহজেই করতে পারতাম। কিন্তু লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রে নতুন যে শর্ত দেওয়া হয়েছে- তা আমাদের জন্য খুবই কষ্টের ব্যাপার। আমরা এ ব্যাপারে অনেক আলোচনা করেছি, দাবি জানিয়েছি। আমরা যদি সংঘবদ্ধ থাকতে পারি তবে আগামী ২২ সেপ্টেম্বরের কনভেনশনে আমাদের দাবি আদায় করে নিতে পারবো। নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে ১০ জন রোগীর জন্য তিন জন ডাক্তার ও ছয় জন নার্স থাকতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারও এই সাপোর্ট দিতে পারবে না। কারণ এই পরিমাণ ডাক্তার বা নার্স সরকারের কাছে নেই। বাংলাদেশের কোন হাসপাতাল বা ক্লিনিকের পক্ষে এই ডাক্তার বা নার্স সংযোজন করা সম্ভব নয়। আমরা বর্তমান সরকারের সাথে স্বাস্থ্য সেবাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। একজন কনসালটেন্ট দুইটার বেশি ক্লিনিকে যেতে পারবে না। তাহলে অন্যান্য ক্লিনিকগুলোতে সেবার অভাবে অটোমেটিক বন্ধ হয়ে যাবে। এতে রোগীরা চরম ভোগান্তি পোহাবে। আমরাও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছে দিচ্ছি। আপনারা ফিল্ডে এসে ক্লিনিক মালিকদের সাথে কথা বলে নীতিমালা তৈরি করুন। অন্যাথায় ক্লিনিকগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। আমাদের দাবি অবাস্তব কোন নীতিমালা চাপিয়ে দেবেন না।
সভার প্রধান অতিথি প্রাক্তন মন্ত্রী ও বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সাতক্ষীরা জেলা শাখার প্রধান উপদেষ্টা ডা. আফতাবুজ্জামান বলেন, অন ইলিভেনের সময় ক্লিনিকের ওপর যে চাপটা আসলো- তখন কি¬িনকগুলো আসলে কীভাবে চলবে তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম। তখন আমরা জানতে পারলাম ঢাকায় একটি কমিটি রয়েছে যার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান হবে। তখন আমরা একত্রিত হয়ে ওখানে গিয়ে বিষয়টির সমাধান করি। যেখানে সরকার মেডিকেল কলেজে ৪০% এর অধিক ডাক্তার সরবরাহ করতে পারছেন না। সেখানে সরকার কীভাবে বলেন, ১০টি বেডের জন্য তিন জন ডাক্তার ও ছয় জন নার্স থাকতে হবে। এই নীতিমালা আসলে বিদেশে চলে, বাংলাদেশে এটা সম্ভব নয়। এজন্য বাস্তবসম্মত একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিৎ। যাতে রোগীরা সহজেই সেবা পেতে পারে সে ব্যবস্থা করা উচিত। আমি অনুরোধ করবো আপনারা যারা ক্লিনিক পরিচালনা করছেন তারা নূন্যতম স্টান্ডার্ডটা বজায় রাখুন। বাকিরা সংঘবদ্ধ থাকুন। যদি কোন সমস্যা হয় তবে তা প্রথমে জেলা নেতৃবৃন্দকে অবহিত করুন। পরে তা কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে জানানো হবে।
সভার প্রধান বক্তা বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ডা. গাজী মিজানুর রহমান বলেন, যে কোন বিষয়ে যখন কোন বাঁধা আসে তখন একটা লড়াই হয়। বাংলাদেশ সরকার সবকিছু ডিজিটালাইজড করছে। এরই ধারাবাহিকতায় স্বাস্থ্য ও সেবা খাতও ডিজিটালাইজড হচ্ছে। আমরাও এই ডিজিটালাইজডকে স্বাগত জানাই। সরকারের সাথে আমরাও একাত্মতা ঘোষণা করে বাংলাদেশকে ডিজিটালাইজড দেশে পরিণত করতে চাই। কিন্তু ক্লিনিকগুলোর ওপর যে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে তা কী যুগোপযোগী হয়েছে? না হয়নি। প্রাইভেট সেক্টরে যদি অগ্রগতি না হতো তবে দেশে স্বাস্থ্য সেবা বিঘিœত হতো। কিন্তু এই নীতিমালা দ্বারা যদি ছোট ছোট ক্লিনিক বন্ধ হয়ে যায় তবে দেশের স্বাস্থ্য সেবা অনেকটাই ভেঙে পড়বে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সরকারের চাপকে অনেক কমিয়ে দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যখনই কোন বাঁধা এসেছে তখনই তা সমিতি গঠন করে সমাধান করা হয়েছে। ১১৯১ সালে প্রথম বেসরকারি স্বাস্থ্য সেবার উপর ১৫% ভ্যাট কার্যকর করা হয়। ২০০৯ সালে তা হাইকোর্টের রিটের মাধ্যমে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। এর পিছনে বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের অনেক অবদান ছিল। আপনারা জানেন পরিবেশ লাইসেন্স করতে এক লক্ষ ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়। এটা কী ছোট খাট কোন ক্লিনিকের পক্ষে করা সম্ভব হবে। এখন কয়েক পাতার ফরম তৈরি হয়েছে। এই ফর্মে কিছু জটিলতা রয়েছে। ভবিষ্যতে এই জটিলতা আর থাকবে না। শ্রম অধিদপ্তরের যে লাইসেন্স এটাও একটা জটিল প্রক্রিয়া। বেসরকারি স্বাস্থ্য সেবা বিল ২০১৪-১৫ সালে তৈরি করা হয়েছে। এই বিলে মালিক পক্ষকে শাস্তিস্বরূপ লক্ষ লক্ষ টাকা জরিমানা দিতে হতো। এজন্য আমাদের কেন্দ্রীয় কমিটি অনেক কাজ করেছে যা সাধারণ সদস্যরা অনেকেই জানেন না। জনবল ঘাটতি স্বাস্থ্য সেবাকে পিছিয়ে রেখেছে।
প্রধান বক্তা আরও বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে এক লক্ষ ৬০ হাজার নার্সের প্রয়োজন কিন্তু আছে মাত্র ৩০ হাজার। এই লিমিটেশনের মধ্যে বাংলাদেশের সকল জনগণকে স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করা সম্ভব নয়। আপনারা যে নীতিমালা প্রণয়ন করছেন তাতে ক্লিনিকগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। এতে সেবা খাত আরও পিছিয়ে যাবে। আমাদের সদস্যরা বেসরকারি সেবা খাতে পাঁচ লক্ষ, ২০ লক্ষ, ৫০ লক্ষ, এক কোটি, পাঁচ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। এখন সরকার নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করে বলছেন ক্লিনিকগুলো বন্ধ করতে। তাহলে এরা কোথায় যাবে। আগামী ২২ সেপ্টেম্বরের কনভেনশনকে সামনে রেখে আমাদের একত্রিত হয়ে কাজ করতে হবে। সেন্ট্রাল কমিটির সাথে সম্পৃক্ত থাকতে হবে। আজকে যদি ১১ হাজার ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক বন্ধ হয়ে যায় তাহলে বুঝতেই পারছেন কী হবে? আমাদের শক্তি কিন্তু ছোট নয়। এজন্য আপনাদের নিয়মিত চাঁদা পরিশোধ করতে হবে। প্রতিজনের জন্য আড়াই হাজার টাকা করে চাঁদা ধার্য করা হয়েছে। সকলকে অবশ্যই এই চাঁদা দিতে হবে। আপনারা নিয়মিত চাঁদা পরিশোধ করে কেন্দ্রীয় কমিটির সাথে সম্পৃক্ত থাকবেন এটাই আপনাদের কাছে আমার প্রত্যাশা। ক্লিনিকের লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রে ৪০ হাজার, ৫০ হাজার ও এক লক্ষ টাকা করা হয়েছে। কথা দিচ্ছি এটা আর থাকবে না।
সভায় বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সাতক্ষীরা জেলা শাখার সভাপতি ডা. মো. হাবিবুর রহমানের সভাপতিত্বে ও যুগ্ম সম্পাদক কামরুজ্জামান রাসেলের সঞ্চালনায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন প্রাক্তন সংসদ সদস্য, স্বাচিপ সাতক্ষীরা শাখার সভাপতি ও বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনস খুলনা শাখার উপদেষ্টা ডা. এস. এম মোখলেছুর রহমান, বিএমএ সাতক্ষীরা শাখার সভাপতি ডা. মো. আজিজুর রহমান, বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন খুলনা শাখার সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. সওকত আলী লস্কর, খুলনা শাখার কোষাধ্যক্ষ ডা. এম. এ হান্নান, সাতক্ষীরা শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. খালেদুর রহমান, সিবি হসপিটালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম আনিছুর রহমান ও তুফান ডেন্টাল ক্লিনিকের পরিচালক ডা. আবুল কালাম বাবলা।
সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, সাতক্ষীরা সদরের আ. আ. ম. আক্তারুজ্জামান, শ্যামনগরের ডা. আকবর হোসেন, কলারোয়ার রমজান আলী, কালিগঞ্জের মিলন কুমার ঘোষ, দেবহাটার রব্বানি, তালার পুলক কুমার পাল প্রমুখ। সভায় আগামী ২২ সেপ্টেম্বর ঢাকায় যে কনভেনশন হবে সেখানে সকলকে উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানানো হয়।
