আবিদা রহমান, সাতক্ষীরা:
নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় কাজের জন্য ঢাকায় চলে যান মা। সাতক্ষীরা শহরের বাড়িতে একা হয়ে পড়া মেয়েটির ওপর তখন পরিবারের কার্যকর নজরদারি ছিল না। এ সময় স্থানীয় এক যুবকের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে মাত্র ১৫ বছর বয়সে বিয়ে হয় তার।
কিন্তু বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই বদলে যায় পরিস্থিতি। কিশোরী জানতে পারে, তার স্বামী নিয়মিত জুয়া খেলেন এবং বিভিন্ন ঋণে জড়িয়ে পড়েছেন। পাওনাদারদের চাপ, পারিবারিক অশান্তি এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মধ্যে একপর্যায়ে স্বামীর বাড়ি ছেড়ে বাবার বাড়িতে ফিরে আসে সে।
মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হলেও আবার পড়াশোনা শুরু করে ওই কিশোরী। সম্প্রতি এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ‘এ-মাইনাস’ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। তার ভাষ্য, বৈবাহিক অশান্তি ও মানসিক চাপ না থাকলে ফল আরও ভালো হতে পারত। এখন সে বিবাহবিচ্ছেদের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছে এবং পড়াশোনা শেষ করে নিজের জীবন নতুন করে গড়ে তুলতে চায়।
ওই কিশোরী বলে, আমি তখন নবম শ্রেণিতে পড়তাম। বিষয়টি বুঝে ওঠার আগেই বিয়ে হয়ে যায়। শুরুতে মনে হয়েছিল সব ঠিক থাকবে। কিন্তু কিছুদিন পর সংসারে সমস্যা শুরু হয়। পরে জানতে পারি, আমার স্বামী নিয়মিত জুয়া খেলত এবং বিভিন্ন ঋণের মধ্যে ছিল। শারীরিক ও মানসিক চাপের মধ্যে থাকতে হয়েছে। একপর্যায়ে আর থাকতে পারিনি। পরিবারের কাছে ফিরে এসে আবার পড়াশোনা শুরু করেছি। আমি পড়াশোনা শেষ করে নিজের মতো করে জীবন গড়তে চাই।
সাতক্ষীরা শহরের এই কিশোরীর অভিজ্ঞতা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। স্থানীয় মানবাধিকারকর্মী ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কাজ করা ব্যক্তিদের ভাষ্য, জেলার উপকূলীয় ও প্রান্তিক এলাকাগুলোতে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার ঘটনা এখনো ঘটছে। কোথাও গোপনে, কোথাও সামাজিক সমঝোতায়, আবার কোথাও এফিডেভিটকে বিয়ের বৈধতার কাগজ হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠছে।
অঙ্গীকারের পরও দুই অপ্রাপ্তবয়স্কের বিয়ে
সম্প্রতি শ্যামনগর উপজেলার দাতিনাখালী এলাকার কলবাড়ি নেকজানিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ১৫ বছর বয়সী এক ছাত্রী এবং পার্শ্ববর্তী এলাকার ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরের বিয়ের ঘটনা সামনে এসেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এর আগে ওই কিশোর-কিশোরী একসঙ্গে বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিল। পরে স্থানীয় ব্যক্তি ও ইউপি সদস্যদের মধ্যস্থতায় দুই পরিবারকে নিয়ে বৈঠক হয়। সেখানে ছেলে ও মেয়ে, দুজনের বয়স পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত বিয়ে দেওয়া হবে না বলে লিখিত অঙ্গীকার করা হয়েছিল।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে ওই অঙ্গীকার উপেক্ষা করে ছেলের বাবা রফিকুল ইসলাম সাতক্ষীরা জজ কোর্টে একজন আইনজীবীর মাধ্যমে নোটারি পাবলিকের এফিডেভিট করান এবং দুই অপ্রাপ্তবয়স্কের বিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে তারা একই বাড়িতে থাকছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
ঘটনাটি নিয়ে প্রশাসনের নজরদারি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাফিউল ইসলাম পাটোয়ারী বলেন, ঘটনাটি আমার কানে এসেছে এবং আমি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। তবে আমাদের আইনি ও দাপ্তরিক কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মহিলা বিষয়ক কার্যালয় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সহায়তা চাইলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে।
শ্যামনগর উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শারিদ বিন শফিক বলেন, ঘটনাটি জানার পর আমরা বিষয়টিকে হালকাভাবে নিইনি। অভিযুক্ত ছেলের বাবাকে আমাদের কার্যালয়ে হাজির হওয়ার জন্য অফিশিয়াল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। তিনি উপস্থিত হলে আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে ছেলের বাবা রফিকুল ইসলামের দাবি, ছেলে ও মেয়ে দুজনই নিজেদের ইচ্ছায় একসঙ্গে থাকতে চেয়েছে। তিনি বলেন, পরিস্থিতি বিবেচনা করে সামাজিকভাবে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করেছি। এফিডেভিটের মাধ্যমে যা করা হয়েছে, তা আমরা সঠিক বলেই মনে করি।
বিয়ের সময় ছেলে ও মেয়ের বয়স আইন নির্ধারিত সীমার নিচে ছিল, এ বিষয়ে তিনি স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি।
বাল্যবিবাহের হার ৭২ শতাংশ
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরায় বাল্যবিবাহের হার প্রায় ৭২ শতাংশ। জেলার মধ্যে শ্যামনগরের মতো উপকূলীয় ও দুর্গম এলাকাগুলোতে এর প্রবণতা বেশি বলে স্থানীয়ভাবে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কাজ করা ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
তাঁদের মতে, শুধু দারিদ্র্য ও অসচেতনতাই বাল্যবিবাহের কারণ নয়; উপকূলীয় এলাকার ভৌগোলিক বাস্তবতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও অনেক পরিবারকে অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তে প্রভাবিত করছে।
সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির সংকট ও লবণাক্ততা দীর্ঘদিনের সমস্যা। স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি অংশ কৃষি, চিংড়ি ও মাছের পোনা সংগ্রহসহ বিভিন্ন কাজে দীর্ঘসময় লোনা পানির মধ্যে থাকতে বাধ্য হন।
স্থানীয়দের মধ্যে এমন একটি ধারণাও রয়েছে যে, নিয়মিত লোনা পানিতে কাজ করলে মেয়েদের ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অল্প বয়সেই বয়সের ছাপ পড়ে। ফলে মেয়ের বয়স বাড়লে ‘ভালো পাত্র পাওয়া যাবে না’ এমন সামাজিক উদ্বেগ থেকে কোনো কোনো পরিবার দ্রুত বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয় মানবাধিকারকর্মীরা।
গাবুরায় অপ্রাপ্তবয়স্ক গর্ভবতী কিশোরী
জলবায়ু সংকট ও ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে বিশেষ ঝুঁকিতে রয়েছে শ্যামনগরের দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরা। চারদিকে নদীবেষ্টিত এই এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণও তুলনামূলক কঠিন।
গাবুরা ইউনিয়নের ডুমুরিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি হেলেনা বিলকিস জানান, তাঁর ক্লিনিকে স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা গর্ভবতী নারীদের মধ্যে অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীও রয়েছে।
তিনি বলেন, ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী গর্ভবতী মেয়েরাও আমাদের ক্লিনিকে আসে। এই বয়সে তাদের শারীরিক ও মানসিক পরিপক্বতা পুরোপুরি তৈরি হয় না। অনেকের মধ্যে রক্তস্বল্পতা, অপুষ্টিসহ নানা ধরনের স্বাস্থ্যগত জটিলতা দেখা যায়।
গাবুরার যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, জরুরি প্রসূতি রোগীকে দ্রুত মূল ভূখণ্ডের হাসপাতালে নেওয়ার মতো উন্নত সড়ক কিংবা সার্বক্ষণিক স্পিডবোট অ্যাম্বুলেন্স সুবিধা না থাকায় রাতে জটিলতা দেখা দিলে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ে।
এফিডেভিট দিয়ে বাল্যবিবাহ বৈধ হয় না
সাতক্ষীরা জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এস এম বিপ্লব হোসেন বলেন, বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী মেয়েদের ন্যূনতম বিয়ের বয়স ১৮ এবং ছেলেদের ২১ বছর।
তিনি বলেন, অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এফিডেভিটে বয়স বেশি দেখিয়ে অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু নোটারি পাবলিকের এফিডেভিট কোনোভাবেই বাল্যবিবাহকে বৈধ করে না।
আইনের ১৯ ধারার ‘বিশেষ বিধান’ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্দিষ্ট বিশেষ পরিস্থিতিতে অপ্রাপ্তবয়স্কের সর্বোত্তম স্বার্থ, আদালতের নির্দেশ এবং অভিভাবকের সম্মতিসহ আইন ও বিধিতে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। “এই ক্ষমতা নোটারি পাবলিকের নয়। তাই শুধু এফিডেভিটের মাধ্যমে অপ্রাপ্তবয়স্কের বিয়ে বৈধ করার সুযোগ নেই,” বলেন তিনি।
বয়স গোপন, ভুয়া তথ্য ব্যবহার অথবা বাল্যবিবাহে সহায়তার অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি এফিডেভিটের অপব্যবহার বন্ধে আদালতসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আইনজীবী সমিতির কঠোর নজরদারি প্রয়োজন বলেও মত দেন এই আইনজীবী।
প্রতিরোধব্যবস্থা কার্যকর হচ্ছে না
দীর্ঘদিন সাতক্ষীরায় মানবাধিকার ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা মাধব দত্ত বলেন, বাল্যবিবাহের উচ্চ হার শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এর পেছনে রয়েছে বহু কিশোরীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক জীবন থেকে ছিটকে পড়ার গল্প।
তিনি বলেন, আমরা নিয়মিত এমন ঘটনা পাই, যেখানে বয়স পূর্ণ না হলেও এফিডেভিট করে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সবাই জানে এটি বেআইনি, তারপরও বন্ধ হচ্ছে না। এর অর্থ কোথাও না কোথাও নজরদারির ঘাটতি রয়েছে।
শ্যামনগরের সাম্প্রতিক ঘটনার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, আগেই ঝুঁকি চিহ্নিত হয়েছিল, লিখিত অঙ্গীকারও নেওয়া হয়েছিল। এরপরও বিয়ে হয়ে গেছে। অর্থাৎ প্রতিরোধব্যবস্থায় দুর্বলতা রয়েছে।
তাঁর মতে, স্থানীয় সরকারকে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আরও সক্রিয় হতে হবে। বিয়ের আগে নির্ভরযোগ্য জন্মনিবন্ধন ও বয়সের প্রমাণ যাচাই নিশ্চিত করা এবং অপ্রাপ্তবয়স্কের বিয়ের খবর পাওয়া মাত্র সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
গোপনে ও রাতে বিয়ে, নজরদারিতে চ্যালেঞ্জ
সাতক্ষীরা জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাজমুন নাহার বলেন, জেলায় বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে নিয়মিত কার্যক্রম চলছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি গিয়ে বিয়ে বন্ধ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, অনেক পরিবার গোপনে, রাতের বেলায় অথবা অন্য জায়গায় নিয়ে গিয়ে বিয়ে সম্পন্ন করছে। কিছু ক্ষেত্রে এফিডেভিটের অপব্যবহার করে বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ফলে সব ঘটনা তাৎক্ষণিকভাবে জানা সম্ভব হয় না।”
স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি আরও জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বাল্যবিবাহের খবর দ্রুত সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো গেলে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হয়।
সাতক্ষীরার বাস্তবতায় বাল্যবিবাহ তাই শুধু পারিবারিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দারিদ্র্য, সামাজিক নিরাপত্তার ঘাটতি, জলবায়ু ও ভৌগোলিক ঝুঁকি, শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া এবং আইন প্রয়োগ ও স্থানীয় নজরদারির কার্যকারিতা।
১৫ বছর বয়সে বিয়ে হওয়া সাতক্ষীরা শহরের সেই কিশোরী আবার বিদ্যালয়ে ফিরেছে। তার সামনে এখন নতুন লক্ষ্য, পড়াশোনা শেষ করা এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানো। কিন্তু জেলার বহু কিশোরীর জন্য সেই সুযোগ তৈরি হওয়ার আগেই বিয়ে তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যতের পথ বদলে দিচ্ছে।
